ছোটবেলায় বৃষ্টি নামার আগে আমার একটা অসুখ হত।

অসুখ বলছি, কারণ আনন্দ বললে ব্যাপারটার খানিক অপমান হয়। দুঃখ বললেও মেলে না। ভয় তো নয়ই। অথচ মেঘ করল, হাওয়া ঠান্ডা হল, দুপুরবেলা হঠাৎ সন্ধের মতো আলো কমে এল, ব্যস, পেটের মধ্যে কে যেন ভেজা হাতে একটা গিঁট দিয়ে দিল। বুক দুরদুর। অকারণ। যেন পাঁচ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে, প্রেমিকা ছেড়ে যাবে এবং বহুদিনের হারানো কেউ বাড়ি ফিরবে, অথচ তখন আমার প্রেমিকা নেই, পড়াশুনা মাথাব‍্যথার কারণ নয়, হারিয়ে যাওয়ার মতো অতীতও বিশেষ জমেনি।

বয়স সাত-আট। সাত-আট বছরের মানুষের আবার অতীত কী?

দুটো ঈদ, কয়েকটা জ্বর, একটা ভাঙা খেলনা, স্কুলে দু-একটা অপমান, মোটামুটি এই।

তবু বৃষ্টি এলে মনে হত, আমার বিরাট একটা অতীত আছে।

এবং তার অধিকাংশটাই আমি ভুলে গেছি।

এই ভুলে যাওয়াটাই সম্ভবত সমস্যার।

বুক ভরে শ্বাস নিলে কান্না পেত। দুঃখের কান্না নয়। দুঃখের কান্না বেশ সভ্য জিনিস, তার কারণ থাকে। কেউ মরে গেছে, কেউ চলে গেছে, কিছু পাওয়া হয়নি। তাকে অন্তত আঙুল দিয়ে দেখানো যায়: ওই যে, ওখানে লেগেছে।

এ কান্নার কোনো ঠিকানা ছিল না।

মনে হত, কিছু একটা হওয়ার কথা ছিল।

হয়নি।

কী?

জানি না।

কোথাও যাওয়ার কথা ছিল।

যাইনি।

কোথায়?

তাও জানি না।

কাউকে পাওয়ার কথা ছিল কি না, সেটাও নিশ্চিত নই। অথচ না-পাওয়াটা দিব্যি টের পেতাম।

এ এক আশ্চর্য বদমাইশি। জীবন তখনও আমাকে কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতিই দেয়নি, তার আগেই আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের মামলা করে বসে আছি।

আর একটা ব্যাপার হত।

গন্ধ।

বৃষ্টি আসার আগে বাতাসে মাঝে মাঝে একজন মানুষের গন্ধ পেতাম।

‘একজন মানুষ’ বলাটাই ঠিক। কারণ গন্ধটা কোনো ফুলের নয়, সাবানের নয়, আতরের নয়, ভেজা মাটিরও নয়। মানুষের। খুব কাছ দিয়ে চলে যাওয়া কারও শরীরে যেমন একটা আলাদা আবহাওয়া থাকে, সেরকম।

চেনা।

অসম্ভব চেনা।

কিন্তু কার?

মা নয়। বাবা নয়। বাড়ির কেউ নয়।

আমি নাক টেনে টেনে মনে করার চেষ্টা করতাম। যেন নাকেরও স্মৃতিশক্তি আছে, একটু চাপ দিলেই নাম-ঠিকানা বলে দেবে।

বলত না।

শুধু বুকটা আরও কেমন করত।

আজকাল অবশ্য সবকিছুর ব্যাখ্যা আছে। গন্ধের সঙ্গে স্মৃতির যোগাযোগ আছে, মস্তিষ্কের অমুক অংশ তমুক অংশের খুব কাছে, শিশুমনের অ্যাসোসিয়েশন হয়, আবহাওয়ার পরিবর্তনে শরীর প্রতিক্রিয়া করে, এসব পড়ে ফেলেছি। বড় হওয়ার একটা প্রধান অসুবিধা এই যে, রহস্যের সঙ্গে দেখা হলেই আমরা তার পরিচয়পত্র দেখতে চাই।

নাম কী?

বৈজ্ঞানিক কারণ কী?

কোন হরমোন?

কোন নিউরন?

যেন ব্যাখ্যা করতে পারলেই অনুভূতিটা আর আমাদের চেয়ে বড় থাকবে না।

কিন্তু আমার সন্দেহ হয়।

সব স্মৃতির আগে ঘটনা ঘটে না।

কখনও কখনও মনে হয়, স্মৃতি ব্যাপারটা সময়ের অত বাধ্য ছাত্র নয়। অতীতেই শুধু তার বাস, কে বলেছে? কোনো কোনো বিকেলে এমন একটা জায়গার জন্য মন খারাপ হয় যেখানে কোনোদিন যাইনি। কোনো কোনো মানুষকে প্রথম দেখেই মনে হয়, এর সঙ্গে একটা অসমাপ্ত কথা আছে। কোনো কোনো গান প্রথমবার শুনে মনে হয়, বহুদিন পর শুনলাম।

এগুলো নিশ্চয়ই মস্তিষ্কের কারসাজি।

কিন্তু মস্তিষ্কই বা এত কারসাজি করে কেন?

ছোটবেলার সেই বৃষ্টিগুলোয় আমার সবচেয়ে বেশি মনে হত, তাড়াহুড়ো করতে হবে।

কীসের তাড়াহুড়ো, জানি না।

সমস্ত সুখ যেন এক্ষুনি ভোগ করে নিই। প্রিয় জিনিসগুলোকে কাছে টেনে নিই। জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকি। হাওয়াটা শেষ হওয়ার আগে যতটা সম্ভব নিই। কারণ একটু পরেই বৃষ্টি নামবে, তারপর থামবে, তারপর রোদ উঠবে, এবং পৃথিবী এমন মুখ করবে যেন কিছুই হয়নি।

এই ‘কিছুই হয়নি’ মুখটা পৃথিবী খুব ভাল করতে পারে।

যেন একটু আগে সে আমাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল না।

যেন হাওয়ার মধ্যে কেউ ছিল না।

যেন আমার কোথাও ফিরে যাওয়ার ছিল না।

এখন এত বছর পরে বুঝি, তখন সম্ভবত আমি কোনো হারানো জিনিস খুঁজছিলাম না।

বরং হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটাই প্রথম আবিষ্কার করছিলাম।

মানুষ বোধহয় জিনিস হারানোর অনেক আগেই ‘হারানো’ বোঝার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়।

তাই আমাদের এমন মানুষের জন্য মন কেমন করতে পারে, যার সঙ্গে এখনও দেখা হয়নি। এমন বাড়ির জন্য ফিরতে ইচ্ছে করতে পারে, যেখানে আমরা কোনোদিন থাকিনি। এমন জীবনের জন্য আফসোস হতে পারে, যা আমাদের ছিলই না।

কী অদ্ভুত।

আজও মেঘ করলে মাঝে মাঝে সেই পুরনো অসুখটা সামান্য ফিরে আসে।

আগের মতো প্রবল নয়। বড় হয়ে শরীর অনেক কিছু সহ্য করতে শেখে, মন আরও বেশি। এখন বৃষ্টি মানে আবছা রাস্তা, ভেজা জুতা, জানলা বন্ধ করা, ফোনে আবহাওয়া দেখা। রহস্যের ওপর দৈনন্দিনের একটা মোটা প্লাস্টিক চাপানো থাকে।

তবু হঠাৎ কোনো ঠান্ডা হাওয়া ভুল করে তার তলা দিয়ে ঢুকে পড়ে।

আমি থেমে যাই।

একবার গভীর করে শ্বাস নিই।

দেখি, সেই গন্ধটা আছে কি না।

নেই।

এত বছরে মানুষটাকেও পাইনি।

এখন অবশ্য আর নিশ্চিত নই, মানুষটা আদৌ ছিল কি না।

হয়তো আমি কোনো মানুষকে চিনতে চেষ্টা করছিলাম না। হয়তো নিজেরই এমন একটা সংস্করণের গন্ধ পেতাম, যে আমার চেয়ে একটু আগে কোথাও পৌঁছে গেছে। যার কাছে আমার না-ঘটা ঘটনাগুলো ঘটেছে, না-পাওয়া জিনিসগুলো পাওয়া হয়েছে, যে জানে আমার ঠিক কোথায় যাওয়ার কথা ছিল।

সে হয়তো কোনো এক বৃষ্টির আগে আমার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল।

আমি শুধু তার গন্ধটুকু পেয়েছিলাম।

মুখটা দেখা হয়নি।

এখনও হয়নি।