পৃথিবীতে এক ধরনের মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে “কেমন আছেন?” প্রশ্নটা কুশলবিনিময় নয় বরং একটি সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী বর্ণনা করবার আমন্ত্রণ।
আপনি নেহাত ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছেন?”
তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। তারপর এমন মুখ করবেন, যেন এই প্রশ্নটির জন্যই গত সাত বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন।
“আর ভালো থাকা…”
এই তিনটি শব্দের পরেই আপনি বুঝবেন, আপনার ভুল হয়ে গেছে।
কারণ আপনি জানতে চাননি তাঁর মেরুদণ্ডের বর্তমান অবস্থা, অফিসের রাজনীতি, ছেলের ভবিষ্যৎ, বাজারদর, দেশের অধঃপতন, পাশের ফ্ল্যাটের অসভ্যতা এবং ২০০৯ সালে এক আত্মীয় তাঁর সঙ্গে কী অন্যায় করেছিলেন। আপনি শুধু “কেমন আছেন” বলেছিলেন। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে প্রশ্ন ছোট হলেও উত্তর মহাকাব্যিক।
অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, মানুষের জীবন মোটামুটি কারওই খুব মসৃণ নয়।
যে লোকটা হাসতে হাসতে বলে, “ভালো আছি”, তার জীবনেও হয়তো গত রাতে ঘুম হয়নি। তারও টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে, সম্পর্ক নিয়ে ক্লান্তি আছে, শরীরে ব্যথা আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় আছে। “ভালো আছি” বলার অর্থ এই নয় যে তার জীবনে কোনো সমস্যা নেই।
অনেক সময় “ভালো আছি” আসলে নিজের দুঃখকে অস্বীকার করা নয়; নিজের দুঃখকে যথাযথ আকারে রাখা।
সব কষ্টকে মাইক্রোফোন দিতে নেই।
কিছু কষ্টকে ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসিয়ে রাখতে হয়, চা দেওয়া যায়, কিন্তু সংসারের কর্তা বানানো যায় না।
আমি নিজে খারাপ থাকলেও প্রায় সবসময় বলি, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।” কেউ বলে, “How are you?” আমি বলি, “Good”, “All good”, “Not bad”, “Great”, “How are you?” ইত্যাদি।
এটা অভিনয় নয়।
বরং আমার মনে হয়, প্রত্যেক সত্য সর্বত্র ঘোষণা করার জন্য তৈরি হয়নি। আমার মন খারাপ একটি সত্য; কিন্তু সেই সত্যের ভার পৃথিবীর প্রত্যেক পরিচিত মানুষের হাতে ধরিয়ে দেওয়া আমার কর্তব্য নয়।
সভ্যতার একটা বড় অংশই সম্ভবত এই ছোট ছোট সংযমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
“কেমন আছেন?”
“ভালো আছি।”
দুজনেই জানেন ব্যাপারটা এত সহজ নয়। তবু কথোপকথন এগিয়ে যায়।
এই সামান্য সামাজিক মিথ্যেটুকুর মধ্যে অদ্ভুত এক মানবিকতা আছে। কারণ মানুষ শুধু সত্য দিয়ে বাঁচে না; মানুষ পরিমিত সত্য দিয়েও বাঁচে।
তবে আরেক ধরনের মানুষ আছেন, যাঁদের মুখ দিয়ে “ভালো আছি” কথাটা যেন বেরোতেই চায় না।
আপনি বললেন, “কেমন আছেন?”
তিনি বললেন, “চলে যাচ্ছে।”
কোথায় যাচ্ছে, কে নিয়ে যাচ্ছে, ফেরত আসবে কি না, কিছুই জানা যায় না।
অথবা বলবেন, “এই তো…”
এই “এই তো”-র মধ্যে পৃথিবীর যাবতীয় ব্যর্থতা এমনভাবে জমা থাকে, যেন সভ্যতার শেষ সূর্যাস্তটি তিনি একাই প্রত্যক্ষ করেছেন।
আরেকটু উন্নত সংস্করণ, “ভালো আর কই?”
এই বাক্যের অসাধারণ সুবিধা হলো, আপনি এর বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি দিতে পারবেন না। আপনি যদি বলেন, “কেন, কী হয়েছে,” আপনি ফাঁদে পড়লেন। আর যদি বলেন, “আচ্ছা”, আপনি হৃদয়হীন।
অবশ্যই মানুষ সব সময় ভালো থাকবে না। বিষণ্ণতা আছে, শোক আছে, অসুস্থতা আছে, এমন দিন আছে যখন “ভালো আছি” বলাটাও নিজের সঙ্গে প্রতারণা মনে হয়। কাছের মানুষের কাছে নিজের কষ্ট খুলে বলা দুর্বলতা নয়; বরং বহু সময় সেটাই সুস্থতার লক্ষণ।
কিন্তু আমি সেই গভীর কষ্টের কথা বলছি না।
আমি বলছি সেই অদ্ভুত অভ্যাসটির কথা, যেখানে অসন্তোষ ধীরে ধীরে অনুভূতি থেকে ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়।
মানুষটি আর সমস্যায় নেই; সমস্যা তাঁর পরিচয় হয়ে গেছে।
তাঁর জীবনে দশটি জিনিস ঘটেছে, সাতটি মোটামুটি ভালো, দুটি নিরপেক্ষ, একটি খারাপ। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্কের সংবাদসম্পাদক প্রথম পাতায় ছাপবেন ওই একটিই।
শিরোনাম:
“সব শেষ।”
সাতটি ভালো খবর যাবে ভিতরের পাতায়, তাও সংক্ষেপে।
মানুষের মন এমনিতেই অভাবের দিকে বেশি তাকায়। যা আছে, তা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়; যা নেই, তা প্রতিদিন নতুন লাগে। সুস্থ শরীর নিয়ে আমরা সকালে উঠি, খবর হয় না। দাঁতে ব্যথা শুরু হলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে দাঁত মহাবিশ্বের কেন্দ্রে চলে আসে।
সুখের সম্ভবত এই দুর্ভাগ্য, সে খুব দ্রুত অভ্যাস হয়ে যায়।
দুঃখের সুবিধা—সে নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়।
তাই “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি” কথাটির মধ্যে আমার কাছে এক ধরনের দর্শন আছে।
এর মানে এই নয়, আমার সব আছে।
এর মানে হতে পারে, যা নেই, আজ তাকে আমার সমস্ত অস্তিত্বের সংজ্ঞা হতে দেব না।
আমার জীবনে অসম্পূর্ণতা আছে, কিন্তু আমার জীবন শুধু অসম্পূর্ণতার নাম নয়।
কৃতজ্ঞতা সম্ভবত সুখী মানুষের পুরস্কার নয়; অনেক সময় সুখী হওয়ার একটি পদ্ধতি।
আমরা সাধারণত ভাবি, আগে জীবন ভালো হবে, তারপর আমি বলব “ভালো আছি।”
হয়তো উল্টোটাও কিছুটা সত্য।
কখনও কখনও “ভালো আছি” বলতে বলতে মানুষ আবিষ্কার করে, সত্যিই তো পুরোপুরি ভালো না হলেও, পুরোপুরি খারাপও তো নেই।
শ্বাস চলছে। কিছু মানুষ এখনও ফোন করে। চা এখনও ভালো লাগে। কোনো একটা গান হঠাৎ পুরোনো বিকেল ফিরিয়ে আনে। রাতে আকাশ দেখা যায়। আগামীকাল সম্পর্কে এখনও সামান্য কৌতূহল আছে।
মানুষের ভালো থাকার জন্য এগুলো খুব ছোট কারণ মনে হয়।
সমস্যা হলো, খারাপ থাকার কারণগুলোকেও দূর থেকে দেখলে অধিকাংশ সময় খুব বড় মনে হয় না।
জীবন সম্ভবত “সব ঠিক হয়ে যাওয়া”-র নাম নয়।
কারণ সব ঠিক হয়ে যাওয়ার দিনটি ক্যালেন্ডারে নেই।
একটা সমস্যা মিটবে, আরেকটা আসবে। একটা চিন্তা যাবে, আরেকটা দরজায় জুতো খুলবে। আমরা যদি সমস্ত সমস্যা শেষ হওয়ার পর ভালো থাকার সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে ভালো থাকা অবসরের পরের কোনো প্রকল্প হয়ে থাকবে, এবং অবসরেও হাঁটুর ব্যথা শুরু হবে।
তাই “ভালো আছি” কখনও পরিস্থিতির রিপোর্ট নয়।
এটা অবস্থান।
জীবনের বিরুদ্ধে মানুষের ছোট্ট একটি রাজনৈতিক ঘোষণা:
তুমি আমাকে যথেষ্ট ঝামেলা দিয়েছ, কিন্তু আমার সমস্ত অনুভূতি দখল করতে পারোনি।
আমি এখনও কাউকে দেখে হাসতে পারি।
আমি এখনও জিজ্ঞেস করতে পারি, “আপনি কেমন আছেন?”
এবং আমার নিজের ভিতরে পাঁচটা যুদ্ধ চললেও বলতে পারি,
“ভালো আছি।”
হয়তো ভালো থাকা সব সময় অনুভূতি নয়।
কখনও কখনও ভালো থাকা একটি শিষ্টাচার।
কখনও একটি অভ্যাস।
কখনও একটি সিদ্ধান্ত।
আর কখনও, সৃষ্টিকর্তা ও জীবনের কাছে নীরবে স্বীকার করা:
সব পাইনি। সব ঠিকও নেই। তবু যা পেয়েছি, তাকে ছোট করে দেখার মতো অকৃতজ্ঞ এখনও হয়ে যাইনি।
অসুখ বলছি, কারণ আনন্দ বললে ব্যাপারটার খানিক অপমান হয়। দুঃখ বললেও মেলে না। ভয় তো নয়ই। অথচ মেঘ করল, হাওয়া ঠান্ডা হল, দুপুরবেলা হঠাৎ সন্ধের মতো আলো কমে এল, ব্যস, পেটের মধ্যে কে যেন ভেজা হাতে একটা গিঁট দিয়ে দিল। বুক দুরদুর। অকারণ। যেন পাঁচ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে, প্রেমিকা ছেড়ে যাবে এবং বহুদিনের হারানো কেউ বাড়ি ফিরবে, অথচ তখন আমার প্রেমিকা নেই, পড়াশুনা মাথাব্যথার কারণ নয়, হারিয়ে যাওয়ার মতো অতীতও বিশেষ জমেনি।
বয়স সাত-আট। সাত-আট বছরের মানুষের আবার অতীত কী?
দুটো ঈদ, কয়েকটা জ্বর, একটা ভাঙা খেলনা, স্কুলে দু-একটা অপমান, মোটামুটি এই।
তবু বৃষ্টি এলে মনে হত, আমার বিরাট একটা অতীত আছে।
এবং তার অধিকাংশটাই আমি ভুলে গেছি।
এই ভুলে যাওয়াটাই সম্ভবত সমস্যার।
বুক ভরে শ্বাস নিলে কান্না পেত। দুঃখের কান্না নয়। দুঃখের কান্না বেশ সভ্য জিনিস, তার কারণ থাকে। কেউ মরে গেছে, কেউ চলে গেছে, কিছু পাওয়া হয়নি। তাকে অন্তত আঙুল দিয়ে দেখানো যায়: ওই যে, ওখানে লেগেছে।
এ কান্নার কোনো ঠিকানা ছিল না।
মনে হত, কিছু একটা হওয়ার কথা ছিল।
হয়নি।
কী?
জানি না।
কোথাও যাওয়ার কথা ছিল।
যাইনি।
কোথায়?
তাও জানি না।
কাউকে পাওয়ার কথা ছিল কি না, সেটাও নিশ্চিত নই। অথচ না-পাওয়াটা দিব্যি টের পেতাম।
এ এক আশ্চর্য বদমাইশি। জীবন তখনও আমাকে কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতিই দেয়নি, তার আগেই আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের মামলা করে বসে আছি।
আর একটা ব্যাপার হত।
গন্ধ।
বৃষ্টি আসার আগে বাতাসে মাঝে মাঝে একজন মানুষের গন্ধ পেতাম।
‘একজন মানুষ’ বলাটাই ঠিক। কারণ গন্ধটা কোনো ফুলের নয়, সাবানের নয়, আতরের নয়, ভেজা মাটিরও নয়। মানুষের। খুব কাছ দিয়ে চলে যাওয়া কারও শরীরে যেমন একটা আলাদা আবহাওয়া থাকে, সেরকম।
চেনা।
অসম্ভব চেনা।
কিন্তু কার?
মা নয়। বাবা নয়। বাড়ির কেউ নয়।
আমি নাক টেনে টেনে মনে করার চেষ্টা করতাম। যেন নাকেরও স্মৃতিশক্তি আছে, একটু চাপ দিলেই নাম-ঠিকানা বলে দেবে।
বলত না।
শুধু বুকটা আরও কেমন করত।
আজকাল অবশ্য সবকিছুর ব্যাখ্যা আছে। গন্ধের সঙ্গে স্মৃতির যোগাযোগ আছে, মস্তিষ্কের অমুক অংশ তমুক অংশের খুব কাছে, শিশুমনের অ্যাসোসিয়েশন হয়, আবহাওয়ার পরিবর্তনে শরীর প্রতিক্রিয়া করে, এসব পড়ে ফেলেছি। বড় হওয়ার একটা প্রধান অসুবিধা এই যে, রহস্যের সঙ্গে দেখা হলেই আমরা তার পরিচয়পত্র দেখতে চাই।
নাম কী?
বৈজ্ঞানিক কারণ কী?
কোন হরমোন?
কোন নিউরন?
যেন ব্যাখ্যা করতে পারলেই অনুভূতিটা আর আমাদের চেয়ে বড় থাকবে না।
কিন্তু আমার সন্দেহ হয়।
সব স্মৃতির আগে ঘটনা ঘটে না।
কখনও কখনও মনে হয়, স্মৃতি ব্যাপারটা সময়ের অত বাধ্য ছাত্র নয়। অতীতেই শুধু তার বাস, কে বলেছে? কোনো কোনো বিকেলে এমন একটা জায়গার জন্য মন খারাপ হয় যেখানে কোনোদিন যাইনি। কোনো কোনো মানুষকে প্রথম দেখেই মনে হয়, এর সঙ্গে একটা অসমাপ্ত কথা আছে। কোনো কোনো গান প্রথমবার শুনে মনে হয়, বহুদিন পর শুনলাম।
এগুলো নিশ্চয়ই মস্তিষ্কের কারসাজি।
কিন্তু মস্তিষ্কই বা এত কারসাজি করে কেন?
ছোটবেলার সেই বৃষ্টিগুলোয় আমার সবচেয়ে বেশি মনে হত, তাড়াহুড়ো করতে হবে।
কীসের তাড়াহুড়ো, জানি না।
সমস্ত সুখ যেন এক্ষুনি ভোগ করে নিই। প্রিয় জিনিসগুলোকে কাছে টেনে নিই। জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকি। হাওয়াটা শেষ হওয়ার আগে যতটা সম্ভব নিই। কারণ একটু পরেই বৃষ্টি নামবে, তারপর থামবে, তারপর রোদ উঠবে, এবং পৃথিবী এমন মুখ করবে যেন কিছুই হয়নি।
এই ‘কিছুই হয়নি’ মুখটা পৃথিবী খুব ভাল করতে পারে।
যেন একটু আগে সে আমাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল না।
যেন হাওয়ার মধ্যে কেউ ছিল না।
যেন আমার কোথাও ফিরে যাওয়ার ছিল না।
এখন এত বছর পরে বুঝি, তখন সম্ভবত আমি কোনো হারানো জিনিস খুঁজছিলাম না।
বরং হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটাই প্রথম আবিষ্কার করছিলাম।
মানুষ বোধহয় জিনিস হারানোর অনেক আগেই ‘হারানো’ বোঝার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়।
তাই আমাদের এমন মানুষের জন্য মন কেমন করতে পারে, যার সঙ্গে এখনও দেখা হয়নি। এমন বাড়ির জন্য ফিরতে ইচ্ছে করতে পারে, যেখানে আমরা কোনোদিন থাকিনি। এমন জীবনের জন্য আফসোস হতে পারে, যা আমাদের ছিলই না।
কী অদ্ভুত।
আজও মেঘ করলে মাঝে মাঝে সেই পুরনো অসুখটা সামান্য ফিরে আসে।
আগের মতো প্রবল নয়। বড় হয়ে শরীর অনেক কিছু সহ্য করতে শেখে, মন আরও বেশি। এখন বৃষ্টি মানে আবছা রাস্তা, ভেজা জুতা, জানলা বন্ধ করা, ফোনে আবহাওয়া দেখা। রহস্যের ওপর দৈনন্দিনের একটা মোটা প্লাস্টিক চাপানো থাকে।
তবু হঠাৎ কোনো ঠান্ডা হাওয়া ভুল করে তার তলা দিয়ে ঢুকে পড়ে।
আমি থেমে যাই।
একবার গভীর করে শ্বাস নিই।
দেখি, সেই গন্ধটা আছে কি না।
নেই।
এত বছরে মানুষটাকেও পাইনি।
এখন অবশ্য আর নিশ্চিত নই, মানুষটা আদৌ ছিল কি না।
হয়তো আমি কোনো মানুষকে চিনতে চেষ্টা করছিলাম না। হয়তো নিজেরই এমন একটা সংস্করণের গন্ধ পেতাম, যে আমার চেয়ে একটু আগে কোথাও পৌঁছে গেছে। যার কাছে আমার না-ঘটা ঘটনাগুলো ঘটেছে, না-পাওয়া জিনিসগুলো পাওয়া হয়েছে, যে জানে আমার ঠিক কোথায় যাওয়ার কথা ছিল।
সে হয়তো কোনো এক বৃষ্টির আগে আমার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল।
খবরটা আমরা পড়েছি। আহা-উহু করেছি। তারপর সম্ভবত আঙুলটা স্ক্রিনে ওপরের দিকে ঠেলে দিয়েছি।
মানুষের সভ্যতার একটা আশ্চর্য সুবিধা হল, এখন শোকও scroll করা যায়।
পুলিশ বলছে, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া থেকে ঘটনার সূত্রপাত। দুজন তরুণ গ্রেপ্তার হয়েছে। অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনও বাকি। অতএব তাদের মাথার ভেতরে ঠিক কী চলছিল, সেটা নিয়ে ফেসবুক-মনোরোগবিদ্যা করার প্রয়োজন নেই।
বরং নিজেদের মাথাটা একটু পরীক্ষা করা যাক।
কারণ চারজন মানুষকে মেরে ফেলার আগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে।
সামনের মানুষটাকে মানুষ বলে মনে হওয়া বন্ধ হয়।
মনোবিজ্ঞানে একটা ভারী নাম আছে, ‘Moral Disengagement’.
সহজ বাংলায়: বিবেককে সাময়িক ছুটি দেওয়া।
মানুষ সাধারণত খুন করতে করতে ভাবে না, “বাহ্, আজ আমি বেশ খারাপ মানুষ হয়ে উঠলাম।”
বরং সে নিজের জন্য একটা গল্প বানায়।
“ও আমাকে বাধ্য করেছে।” “ওই লোকটাই ঝামেলা শুরু করেছে।” “এখন আর উপায় নেই।”
খেয়াল করুন, এই গল্পে খুনি কখনও villain নয়।
সে পরিস্থিতির শিকার।
মানুষের মস্তিষ্কের এই ক্ষমতাটি দুর্দান্ত। আমরা অন্যকে শেষ করে দিয়েও নিজেদের কাছে নির্দোষ থাকার রাস্তা বের করতে পারি।
তারপর আসে আরেক ধাপ।
মানুষটি আর মানুষ থাকে না।
সে হয়ে যায়, “বাধা”। “সমস্যা”। “সাক্ষী”।
একটি বারো বছরের শিশুও তখন আর বারো বছরের শিশু নয়।
সে শুধু এমন একজন, যে দেখে ফেলেছে।
এই জায়গাটা ভয়ংকর।
কারণ সভ্যতার আসল ভিত্তি আইন নয়।
আইন তো খুনের পর আসে, পুলিশের গাড়িতে চড়ে।
সভ্যতার আসল ভিত্তি হল সেই কয়েক সেকেন্ড, যখন আপনি প্রচণ্ড রেগে আছেন, অপমানিত হয়েছেন, নেশাগ্রস্ত, আতঙ্কিত, তবু আপনার মাথার কোথাও একটা ক্ষীণ স্বর বলছে:
“না। এটুকু আমি করব না।”
ওই “না”-টার নামই সভ্যতা।
আমরা অবশ্য সমস্ত দায় ইয়াবার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারি।
খুব সুবিধা হবে।
মাদক ভয়ংকর। Stimulant abuse judgment, impulse control ও aggression-এর ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু “ইয়াবা মানুষকে খুনি বানায়”, এই বাক্যটি আমাদের খুব আরাম দেয়, কারণ তাহলে খুনিটা আমাদের প্রজাতির কেউ নয়।
সে “নেশাখোর”।
অর্থাৎ আমরা আলাদা।
এই আলাদা হওয়ার আনন্দটাই সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ ইতিহাসের অধিকাংশ নৃশংসতা দৈত্যরা করেনি।
মানুষ করেছে।
মানুষই আরেক মানুষকে “বাধা” বলেছে। মানুষই নিজের অপরাধের যুক্তি বানিয়েছে। মানুষই রাতে বাড়ি ফিরে নিজের সন্তানকে আদর করেছে।
তাই রংপুরের ঘটনাটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন “ওরা কীভাবে পারল?” নয়।
প্রশ্নটা হল,
একজন মানুষের ভিতরে ঠিক কোন কোন জিনিস ভেঙে গেলে সে পারে?
আর তার চেয়েও অস্বস্তিকর প্রশ্ন,
সেই ভাঙার শব্দ কি তার পরিবার, পাড়া, বন্ধু, সমাজ, কেউ আগে শুনেছিল?
শুনেও কি ভেবেছিল,
“আমার কী?”
চারজন মানুষ মারা গেছেন।
এখন আমরা বিচার চাইব। অবশ্যই চাইব।
তারপর নতুন একটা ঘটনা আসবে। নতুন ছবি। নতুন ক্ষোভ। নতুন হ্যাশট্যাগ।
আমরা আগেরটা ভুলে যাব।
কারণ আমাদের সময়ের সবচেয়ে সফল মাদক সম্ভবত ইয়াবা নয়।
ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা।
আরেকটা কথাও ভুলে গেলে চলবে না,
একটা সমাজ কতটা নিরাপদ, তা বোঝা যায় শক্তিশালী মানুষ কতটা স্বাধীন, তা দিয়ে নয়; বোঝা যায় একজন নিরীহ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কতটা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা দিয়ে।
এই চারটি মৃত্যু আমাদের সেই পরীক্ষায় ভয়াবহভাবে অকৃতকার্য করিয়ে দিয়েছে।
খবরটা আমরা পড়েছি। আহা-উহু করেছি। তারপর সম্ভবত আঙুলটা স্ক্রিনে ওপরের দিকে ঠেলে দিয়েছি।
মানুষের সভ্যতার একটা আশ্চর্য সুবিধা হল, এখন শোকও scroll করা যায়।
পুলিশ বলছে, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া থেকে ঘটনার সূত্রপাত। দুজন তরুণ গ্রেপ্তার হয়েছে। অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনও বাকি। অতএব তাদের মাথার ভেতরে ঠিক কী চলছিল, সেটা নিয়ে ফেসবুক-মনোরোগবিদ্যা করার প্রয়োজন নেই।
বরং নিজেদের মাথাটা একটু পরীক্ষা করা যাক।
কারণ চারজন মানুষকে মেরে ফেলার আগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে।
সামনের মানুষটাকে মানুষ বলে মনে হওয়া বন্ধ হয়।
মনোবিজ্ঞানে একটা ভারী নাম আছে, ‘Moral Disengagement’.
সহজ বাংলায়: বিবেককে সাময়িক ছুটি দেওয়া।
মানুষ সাধারণত খুন করতে করতে ভাবে না, “বাহ্, আজ আমি বেশ খারাপ মানুষ হয়ে উঠলাম।”
বরং সে নিজের জন্য একটা গল্প বানায়।
“ও আমাকে বাধ্য করেছে।” “ওই লোকটাই ঝামেলা শুরু করেছে।” “এখন আর উপায় নেই।”
খেয়াল করুন, এই গল্পে খুনি কখনও villain নয়।
সে পরিস্থিতির শিকার।
মানুষের মস্তিষ্কের এই ক্ষমতাটি দুর্দান্ত। আমরা অন্যকে শেষ করে দিয়েও নিজেদের কাছে নির্দোষ থাকার রাস্তা বের করতে পারি।
তারপর আসে আরেক ধাপ।
মানুষটি আর মানুষ থাকে না।
সে হয়ে যায়, “বাধা”। “সমস্যা”। “সাক্ষী”।
একটি বারো বছরের শিশুও তখন আর বারো বছরের শিশু নয়।
সে শুধু এমন একজন, যে দেখে ফেলেছে।
এই জায়গাটা ভয়ংকর।
কারণ সভ্যতার আসল ভিত্তি আইন নয়।
আইন তো খুনের পর আসে, পুলিশের গাড়িতে চড়ে।
সভ্যতার আসল ভিত্তি হল সেই কয়েক সেকেন্ড, যখন আপনি প্রচণ্ড রেগে আছেন, অপমানিত হয়েছেন, নেশাগ্রস্ত, আতঙ্কিত, তবু আপনার মাথার কোথাও একটা ক্ষীণ স্বর বলছে:
“না। এটুকু আমি করব না।”
ওই “না”-টার নামই সভ্যতা।
আমরা অবশ্য সমস্ত দায় ইয়াবার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারি।
খুব সুবিধা হবে।
মাদক ভয়ংকর। Stimulant abuse judgment, impulse control ও aggression-এর ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু “ইয়াবা মানুষকে খুনি বানায়”, এই বাক্যটি আমাদের খুব আরাম দেয়, কারণ তাহলে খুনিটা আমাদের প্রজাতির কেউ নয়।
সে “নেশাখোর”।
অর্থাৎ আমরা আলাদা।
এই আলাদা হওয়ার আনন্দটাই সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ ইতিহাসের অধিকাংশ নৃশংসতা দৈত্যরা করেনি।
মানুষ করেছে।
মানুষই আরেক মানুষকে “বাধা” বলেছে। মানুষই নিজের অপরাধের যুক্তি বানিয়েছে। মানুষই রাতে বাড়ি ফিরে নিজের সন্তানকে আদর করেছে।
তাই রংপুরের ঘটনাটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন “ওরা কীভাবে পারল?” নয়।
প্রশ্নটা হল,
একজন মানুষের ভিতরে ঠিক কোন কোন জিনিস ভেঙে গেলে সে পারে?
আর তার চেয়েও অস্বস্তিকর প্রশ্ন,
সেই ভাঙার শব্দ কি তার পরিবার, পাড়া, বন্ধু, সমাজ, কেউ আগে শুনেছিল?
শুনেও কি ভেবেছিল,
“আমার কী?”
চারজন মানুষ মারা গেছেন।
এখন আমরা বিচার চাইব। অবশ্যই চাইব।
তারপর নতুন একটা ঘটনা আসবে। নতুন ছবি। নতুন ক্ষোভ। নতুন হ্যাশট্যাগ।
আমরা আগেরটা ভুলে যাব।
কারণ আমাদের সময়ের সবচেয়ে সফল মাদক সম্ভবত ইয়াবা নয়।
ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা।
আরেকটা কথাও ভুলে গেলে চলবে না,
একটা সমাজ কতটা নিরাপদ, তা বোঝা যায় শক্তিশালী মানুষ কতটা স্বাধীন, তা দিয়ে নয়; বোঝা যায় একজন নিরীহ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কতটা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা দিয়ে।
এই চারটি মৃত্যু আমাদের সেই পরীক্ষায় ভয়াবহভাবে অকৃতকার্য করিয়ে দিয়েছে।
মানুষের শরীরের বা জৈবিক চাহিদার একটা ক্যালেন্ডার আছে। সমাজের আর-একটা।
দুটো ক্যালেন্ডার একই প্রকাশনা সংস্থা থেকে বের হয় না।
সমস্যা সেখানেই।
দক্ষিণ এশিয়ায় (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ইত্যাদি); একটি বিষয় নিয়ে খুব কম কথা হলেও বিষয়টি নীরবে বহু মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাসের অংশ।
শুরুতেই বলে রাখি, এখানে তৃতীয় লিঙ্গের কথা হচ্ছে না। কিংবা ঠিক সমকামী মানুষের কথাও বলছি না। কারণ, আমাদের একটা পুরনো অভ্যাস হচ্ছে, যে কোনো male-to-male sexual behaviour দেখলেই তাকে কোনো এক sexual orientation বলে ঘোষণা করে দি। যেন আচরণ আর পরিচয় একই বস্তু। অথচ মনোবিজ্ঞানের অভিধান এই সরলীকরণকে খুব একটা সমর্থন করে বলে আমার জানা নেই।
যাই হোক, আমি বলছি এমন কিছু “straight” বা “heterosexual” পুরুষের কথা, যাদের emotional attraction, romantic attraction, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি জীবনের পরিকল্পনাও একজন নারীকে কেন্দ্র করেই। তারা প্রেম করে বা করতে চায় নারীর সঙ্গে। বিয়েও করে বা করতে চায় নারীকেই।
তবু, কোনো এক সময়ে তারা MMM, fr****ng কিংবা অন্য কোনো male-to-male sexual activity-তে জড়িয়ে পড়ে। কখনও সরাসরি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিডিওকলে বা ভার্চুয়ালি।
ঘটনাটা শেষ হওয়ার পরে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে। নিজের কাছেই যেন নিজের জবাবদিহি করতে হয়, “আমি এটা করলাম কেন?” বা হয়তো নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিয়ে বলে, “তুই এতো খারাপ”, “ছিঃ ছিঃ কি না পাপ হলো!” ইত্যাদি।
তারপর কিছুদিন কেটে যায়।
ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকা কোনো এক নারীকে দেখে উত্তেজনা বাড়ে।
শরীর আবার দরজায় কড়া দেয়।
এবং আবার সে অন্য এক পরিচিত/অপরিচিত পুরুষের সাথে এইসব কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে যার অবস্থা এই পুরুষটির মতোই। লুপ এর মতো এইটা চলতে থাকে।
অপরাধবোধ তখন নৈতিকতার ভাষায় কথা বলে, শরীর কথা বলে জৈববিজ্ঞানের ভাষায়। এই দুই ভাষার অভিধান এক নয়।
আমি একজন mental health practitioner হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বহুবার ভেবেছি; এই মানুষগুলোকে আমরা খুব দ্রুত বিচার করি, কিন্তু কারণগুলো খুব কম বুঝতে চাই।
আমার পর্যবেক্ষণে, সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হলো companionship-এর দীর্ঘ অনুপস্থিতি। সামাজিক নিয়মের কারণে অনেকেই বিপরীত লিঙ্গের কারও সঙ্গে একটি স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না।
কারণ হাজারটা।
হয়তো সে অতিরিক্ত ভদ্র।
হয়তো অতিরিক্ত বখাটে।
হয়তো তার social skill নেই।
হয়তো সাহস নেই।
বা টাকা নেই, বা অনেক টাকা।
হয়তো দেখতে প্রচলিত অর্থে আকর্ষণীয় নয়।
হয়তো কোনো মেয়েই তাকে পাত্তা দিচ্ছে না, মুখের ওপর ‘ভাই’ বানিয়ে দিচ্ছে।
এবং পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসতেই হবে; এমন কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও হয়তো নেই।
তারপর শুরু হয় সমাজের ম্যারাথন।
আগে পড়াশোনা।
তারপর চাকরি।
তারপর আরও ভালো চাকরি।
তারপর টাকা।
এরপর আরো একটু বেশী টাকা।
তারপর স্থায়িত্ব।
তারপর বিয়ে।
সমাজ বারবার বলছে, “আরও একটু অপেক্ষা করো।”
কিন্তু শরীর অপেক্ষা করতে শেখেনি।
হরমোন, বিশ্ববিদ্যালয়ের convocation দেখে নিঃসৃত হয় না।
লিবিডো বেতনের স্লিপ দেখে জাগে না।
জৈবিক পরিপক্বতা HR department-এর approval letter-এর অপেক্ষা করে না।
এই জায়গাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়।
আমরা সময়কে খুব সরলভাবে দেখি। ক্যালেন্ডারের পাতায় জানুয়ারির পরে ফেব্রুয়ারি আসে। কিন্তু শরীরের সময় এতটা সরলরেখায় হাঁটে না।
অনেকটা ব্ল্যাকহোলের কাছে সময়ের মতো; একই ঘড়ি, অথচ অন্যরকম অভিজ্ঞতা। সমাজ বলছে, “আরও পাঁচ বছর।” শরীর বলছে, “আমার পাঁচ বছর তো ইতিমধ্যেই কেটে গেছে।” Interstellar মুভির Miller’s Planet সিকোয়েন্সটার মতো।
সম্ভবত এই কারণেই প্রাচীন ধর্মীয় পরম্পরায় বারবার একটি কথা ফিরে আসে; যথাসময়ে (বর্তমান সমাজব্যবস্থায় যার আরেক অর্থ ‘unsettled’ অবস্থায়) বিয়ে। আমি এটাকে শুধু ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবে দেখি না, বা প্রাগৈতিহাসিক যুগের outdated প্রথাগুলোর একটা হিসেবেও দেখি না।
এর ভেতরে হয়তো মানুষের জৈবিক বাস্তবতাকে বোঝারও একটি চেষ্টা ছিল। অবশ্যই এর মানে এই নয় যে বিয়ে সব সমস্যার সমাধান, কিংবা যার বিয়ে হয়নি সে-ই এমন আচরণ করবে। মানুষ কখনো এত সরল সমীকরণে ধরা দেয় না।
কিন্তু এটাও কি সত্য নয়, দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তি মানুষকে বিকল্প পথ খুঁজতে শেখায়?
আরেকটি বিষয় ভাববার আছে।
“এই generation-এর মধ্যেই এইসব কেচ্ছা আছে। কই আমাদের সময়ে তো…”
এই কথাটা হয়তো ঠিক নয়। আমি উল্টোটা ভাবি।
আমার ধারণা, এই আচরণ নতুন নয়। নতুন হলো এর দৃশ্যমানতা।
একসময় মানুষের গোপনীয়তার একমাত্র সাক্ষী ছিল ডায়েরি।
আজ সাক্ষী হলো encrypted chat, anonymous profile আর video call।
আগে পাশের বাড়ির মেয়েটা বা ছেলেটা ঈদে কি জামা কিনলো তা দেখতে পাওয়া যেতে ঈদের দিন ভোরবেলা।
এখন পাশের বাড়ির বান্টুর বাবা সপ্তাহে কয় প্যাকেট বিরিয়ানী কিনে বাড়ি ফেরে আর সেই বিরিয়ানী খেয়ে বান্টুর দাদুর কয়দিন বুক জ্বালা করে সেই খবরও পাশের বাড়িতে থেকে আমরা পাই প্রতিদিন। Thanks to facebook reels and stories. এতে অন্তত বিরিয়ানীর দোকান নিয়ে বান্টুর করা ভিডিও রিভিউটা কাজে দেয়।
প্রযুক্তি সবসময় নতুন আচরণ সৃষ্টি করে না।
অনেক সময় প্রযুক্তি কেবল পুরনো আচরণকে দৃশ্যমান করে।
নারীদের ক্ষেত্রে একই বিষয় কতটা ঘটে?
সঠিক উত্তর হলো, আমি এখনো যথেষ্ট investigation করিনি। তাই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না। আমার অনুমান আছে, কিন্তু অনুমানকে তথ্যের ছদ্মবেশ পরাতে আমি রাজি নই।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো orientation-কে প্রশ্ন করা নয়। কোনো identity-কে আক্রমণ করাও নয়।
উদ্দেশ্য শুধু একটি প্রশ্ন করা।
সমাজ যদি একজন পুরুষকে যৌন ও আবেগগত ঘনিষ্ঠতার বৈধ সুযোগ পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে বলে, অথচ তার শরীর যদি সেই অপেক্ষার ব্যাকরণই না জানে বা বোঝে, তাহলে সেই অপেক্ষার দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করে?