রংপুরে চারজন মানুষ খুন হয়েছেন।

একজন বাবা। একজন মা। এক মেয়ে। এক শিশু।

খবরটা আমরা পড়েছি।
আহা-উহু করেছি।
তারপর সম্ভবত আঙুলটা স্ক্রিনে ওপরের দিকে ঠেলে দিয়েছি।

মানুষের সভ্যতার একটা আশ্চর্য সুবিধা হল, এখন শোকও scroll করা যায়।

পুলিশ বলছে, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া থেকে ঘটনার সূত্রপাত। দুজন তরুণ গ্রেপ্তার হয়েছে। অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনও বাকি। অতএব তাদের মাথার ভেতরে ঠিক কী চলছিল, সেটা নিয়ে ফেসবুক-মনোরোগবিদ্যা করার প্রয়োজন নেই।

বরং নিজেদের মাথাটা একটু পরীক্ষা করা যাক।

কারণ চারজন মানুষকে মেরে ফেলার আগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে।

সামনের মানুষটাকে মানুষ বলে মনে হওয়া বন্ধ হয়।

মনোবিজ্ঞানে একটা ভারী নাম আছে, ‘Moral Disengagement’.

সহজ বাংলায়:
বিবেককে সাময়িক ছুটি দেওয়া।

মানুষ সাধারণত খুন করতে করতে ভাবে না,
“বাহ্‌, আজ আমি বেশ খারাপ মানুষ হয়ে উঠলাম।”

বরং সে নিজের জন্য একটা গল্প বানায়।

“ও আমাকে বাধ্য করেছে।”
“ওই লোকটাই ঝামেলা শুরু করেছে।”
“এখন আর উপায় নেই।”

খেয়াল করুন, এই গল্পে খুনি কখনও villain নয়।

সে পরিস্থিতির শিকার।

মানুষের মস্তিষ্কের এই ক্ষমতাটি দুর্দান্ত। আমরা অন্যকে শেষ করে দিয়েও নিজেদের কাছে নির্দোষ থাকার রাস্তা বের করতে পারি।

তারপর আসে আরেক ধাপ।

মানুষটি আর মানুষ থাকে না।

সে হয়ে যায়,
“বাধা”।
“সমস্যা”।
“সাক্ষী”।

একটি বারো বছরের শিশুও তখন আর বারো বছরের শিশু নয়।

সে শুধু এমন একজন, যে দেখে ফেলেছে।

এই জায়গাটা ভয়ংকর।

কারণ সভ্যতার আসল ভিত্তি আইন নয়।

আইন তো খুনের পর আসে, পুলিশের গাড়িতে চড়ে।

সভ্যতার আসল ভিত্তি হল সেই কয়েক সেকেন্ড, যখন আপনি প্রচণ্ড রেগে আছেন, অপমানিত হয়েছেন, নেশাগ্রস্ত, আতঙ্কিত, তবু আপনার মাথার কোথাও একটা ক্ষীণ স্বর বলছে:

“না। এটুকু আমি করব না।”

ওই “না”-টার নামই সভ্যতা।

আমরা অবশ্য সমস্ত দায় ইয়াবার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারি।

খুব সুবিধা হবে।

মাদক ভয়ংকর। Stimulant abuse judgment, impulse control ও aggression-এর ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু “ইয়াবা মানুষকে খুনি বানায়”, এই বাক্যটি আমাদের খুব আরাম দেয়, কারণ তাহলে খুনিটা আমাদের প্রজাতির কেউ নয়।

সে “নেশাখোর”।

অর্থাৎ আমরা আলাদা।

এই আলাদা হওয়ার আনন্দটাই সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক।

কারণ ইতিহাসের অধিকাংশ নৃশংসতা দৈত্যরা করেনি।

মানুষ করেছে।

মানুষই আরেক মানুষকে “বাধা” বলেছে।
মানুষই নিজের অপরাধের যুক্তি বানিয়েছে।
মানুষই রাতে বাড়ি ফিরে নিজের সন্তানকে আদর করেছে।

তাই রংপুরের ঘটনাটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন “ওরা কীভাবে পারল?” নয়।

প্রশ্নটা হল,

একজন মানুষের ভিতরে ঠিক কোন কোন জিনিস ভেঙে গেলে সে পারে?

আর তার চেয়েও অস্বস্তিকর প্রশ্ন,

সেই ভাঙার শব্দ কি তার পরিবার, পাড়া, বন্ধু, সমাজ, কেউ আগে শুনেছিল?

শুনেও কি ভেবেছিল,

“আমার কী?”

চারজন মানুষ মারা গেছেন।

এখন আমরা বিচার চাইব। অবশ্যই চাইব।

তারপর নতুন একটা ঘটনা আসবে।
নতুন ছবি।
নতুন ক্ষোভ।
নতুন হ্যাশট্যাগ।

আমরা আগেরটা ভুলে যাব।

কারণ আমাদের সময়ের সবচেয়ে সফল মাদক সম্ভবত ইয়াবা নয়।

ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা।

আরেকটা কথাও ভুলে গেলে চলবে না,

একটা সমাজ কতটা নিরাপদ, তা বোঝা যায় শক্তিশালী মানুষ কতটা স্বাধীন, তা দিয়ে নয়;
বোঝা যায় একজন নিরীহ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কতটা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা দিয়ে।

এই চারটি মৃত্যু আমাদের সেই পরীক্ষায় ভয়াবহভাবে অকৃতকার্য করিয়ে দিয়েছে।