সেদিন শুক্রবার ছিল।
সকাল দশটা ত্রিশের কাছাকাছি। রিভারডেল অফিসের জানালায় অক্টোবরের বিবর্ণ আলো এসে পড়েছিল। আকাশে রোদ নেই, বৃষ্টিও নেই। শুধু কাচের ওপারে ঝুলে থাকা ছাইরঙা এক সকাল।
অফিসটা অস্বাভাবিক শান্ত।
রিসেপশনের ডেস্কে কেউ আছে বোধহয়। পাশের কক্ষের দরজা বন্ধ। করিডোরের শেষ মাথায় ছোট রান্নাঘর থেকে ফ্রিজের গুনগুন শব্দ আসছে। মাঝেমধ্যে দেয়ালের পুরোনো ঘড়িটা নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে,
টিক।
টিক।
টিক।
আমি কম্পিউটারের পর্দায় একটি রিপোর্ট শেষ করছিলাম। ডেডলাইন আজই। হাতে খুব বেশি সময় নেই।
ঠিক তখনই মনে হলো, ঘরের আলোটা যেন সামান্য কমে গেছে।
মাথা তুলে দরজার দিকে তাকালাম।
সেখানে রায়ান দাঁড়িয়ে।
কখন এসেছে, কীভাবে এসেছে, আমি শুনতেই পাইনি।
দরজায় কড়া নাড়েনি। “হ্যালো” বলেনি। আমি যে ঘরটায় বসে, সেই অবধি আসতে হলে এক লম্বা করিডর হেঁটে আসতে হয়। হেঁটে এলে ধুপঝাপ শব্দ হয়। পাশেই রান্নাঘরে কেউ গেলে আমি বুঝতে পারি।
রায়ানের পায়ের শব্দ করিডোরে ওঠেনি। যেন এতক্ষণ সে দরজার ওপাশে ছিল না; আচমকা দেয়াল থেকে আলাদা হয়ে মানুষের আকার নিয়েছে।
প্রথম কয়েক সেকেন্ড তাকে চিনতে কষ্ট হলো।
ছয় মাস আগে শেষ দেখা। তখন চুল ছোট ছিল, মুখে কিছুটা মাংস ছিল। এখন চুল ঘাড় ছুঁয়েছে। গাল বসে গেছে। চোখের নিচে ছায়া। কালো জ্যাকেটের ভেতর শরীরটা আগের চেয়ে অনেক সরু।
শুধু চোখ দুটো রোগা হয়নি।
বরং শরীরের সমস্ত শক্তি যেন এসে সেখানে জমা হয়েছে।
– রায়ান?
তার মুখের কোণায় ধীরে হাসি ফুটল।
– হাই।
– অনেক দিন পর! কেমন আছ?
– আমি ভালো আছি। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, তোমাকে হাই বলে যাই।
কথাটা খুব সাধারণ।
তবু কী যেন মিলল না।
মানুষ যখন পুরোনো পরিচিত কাউকে হঠাৎ দেখে, তার মুখে সাধারণত কোনো না কোনো আবেগ আসে, স্বস্তি, দ্বিধা, সংকোচ, আনন্দ। রায়ানের মুখে কিছুই এল না। হাসিটা ঠোঁটে ছিল, কিন্তু চোখে পৌঁছায়নি।
সে শুধু দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছিল।
আমি তাকে বহুদিন ধরে চিনি। একসময় নিয়মিত সেশনে আসতো। মুখিয়ে থাকতো আমার সাথে একটা সেশন নেয়ার জন্য। আমাদের মধ্যে ভালো rapport ছিল। আমার ওপর তার আস্থাও ছিল। অনেক বেশি শেয়ার করেছে। তাই তাকে দেখে অস্বস্তির পাশাপাশি সত্যিকারের আনন্দও হয়েছিল।
আমি সেই পরিচিত উষ্ণতাটুকুই কণ্ঠে রাখলাম।
– এসো, ভেতরে বসো।
সে ঢুকে চেয়ার টেনে বসল। কাঁধের ব্যাগটি পায়ের কাছে রাখল।
– কফি খাবে? পানি?
– না। কিছু লাগবে না।
আমি বসতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় বলল,
– আসলে পানি খাব।
উত্তরটা এল এত দ্রুত, যেন আমাকে আবার উঠতে দেখাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
আমি রান্নাঘরের দিকে গেলাম।
রান্নাঘরটি আমার কক্ষের ঠিক পাশে আগেই বলেছি। রায়ান যেখানে বসে, সেখান থেকে রান্নাঘরের সিঙ্ক পর্যন্ত দেখা যায়।
কল ছেড়ে গ্লাসে পানি ভরছিলাম।
হঠাৎ আমার ঘাড়ের পেছনের চামড়া শক্ত হয়ে গেল।
কোনো শব্দ শুনিনি। আয়নায় কোনো প্রতিবিম্ব দেখিনি। তবু শরীরের প্রতিটি স্নায়ু আমাকে বলল,
রায়ান আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
মানুষ বলে, মেয়েদের নাকি তৃতীয় চোখ থাকে। পেছন থেকেও তারা কারও দৃষ্টি টের পায়। সেদিন প্রথমবার মনে হয়েছিল, আমার মাথার পেছনেও বুঝি একটি চোখ খুলে গেছে।
সেই চোখ দিয়ে আমি রায়ানকে দেখতে পাচ্ছিলাম।
চেয়ারে নিশ্চুপ বসে আছে। মাথা সামান্য কাত। দৃষ্টি আমার পিঠে। আমি কীভাবে হাঁটি, কোন হাত দিয়ে গ্লাস ধরি, সব লক্ষ করছে।
কল্পনা?
হতে পারে।
কিন্তু সেই মুহূর্তে ঘুরে তাকানোর কথা ভাবলাম না। ভয় পেয়ে নয়। আমি চাইনি সে বুঝুক, তার দৃষ্টি আমি টের পেয়েছি।
গ্লাস ভরে স্বাভাবিক গতিতে পেছন ফিরলাম।
রায়ান সত্যিই তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ঠিক আমার কাঁধের দিকে হয়তো।
চোখে চোখ পড়তেই সে দৃষ্টি সরাল না।
আমি হাসলাম। সে হাসল না।
ঘরে ঢুকে দরজা টেনে দিলাম। এমন সেশনে কেউ এলে কথাবার্তার সময় দরজা বন্ধ করে দেয়াটা বাধ্যতামূলক। দরজাটি বন্ধ হওয়ার মৃদু শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে আরেকটি শব্দ হলো,
ভুল করলে, এই দরজাটাই বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
পানির গ্লাসটি তার দিকে এগিয়ে দিতে গিয়ে টেবিলের ওপর চোখ পড়ল। তাতে রাখা আছে,
একটি কালো ডায়েরি।
একটি নীল ক্লিক-পেন।
একটি সানগ্লাস।
একটি কাঠের চামচ।
চারটি জিনিস পাশাপাশি সাজানো।
রায়ান ঢোকার সময় এগুলো তার হাতে ছিল না। আমি পানি আনতে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ব্যাগ থেকে বের করে রেখেছে।
কলম আর ডায়েরি স্বাভাবিক।
সানগ্লাসও হতে পারে।
কিন্তু কাঠের চামচ?
কোনো খাবার নেই। কফি নেই। চামচের প্রয়োজন নেই। অথচ চারটি জিনিসের মধ্যে সেটিই যেন সবচেয়ে যত্ন করে রাখা।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
অকারণে কোনো বিষয়ের ওপর আলো ফেললে মানুষের মনও সেদিকে ঘুরে যায়। চামচটি যদি নিরীহ হয়, তাকে নিরীহই থাকতে দিতে হবে।
আমি নিজের চেয়ারে বসলাম।
– অনেক দিন হলে। কোথায় ছিলে? জিজ্ঞেস করলাম। কী করছ এখন?
রায়ান গ্লাস হাতে নিল, কিন্তু পানি খেল না।
– ফ্রিল্যান্সিং করছি।
শুনে একটু অবাক আর একইসাথে আনন্দিত হলাম।
– বাহ! কী ধরনের কাজ?
সে সামান্য সামনে ঝুঁকল। আমার দিকে দৃঢ়ভাবে তাকিয়ে বলল,
– আমি এখন গুপ্তচর।
কণ্ঠে ঠাট্টার আভাস নেই।
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হাসিনি, বিস্ময়ও দেখালাম না। কথাটা শুনে একটু নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি কোনো কিছুর আভাস পাচ্ছি?
মেন্টাল হেলথ সেশনে সামনে বসে থাকা কেউ যখন এমন কথা বলে যা তার হওয়াটা স্বাভাবিক নয়, তখন মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। মনে হাজারটা প্রশ্ন আসে। কয়েকটা যুক্তি খাঁড়া করার আপ্রাণ চেষ্টা করে মস্তিষ্ক। আর এই পুরো ব্যাপারটায় থেরাপিস্টের মাথায় ঘটে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে।
যেহেতু রায়ানের হিস্ট্রি আমার পুরোটা জানা আছে, ওর কথা শুনেই প্রথম ও একমাত্র যে সম্ভাবনার প্রশ্ন আমার মাথায় এলো তা হলো,
সে কি কোনো মেন্টাল হেলথ এপিসোডের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে? বইয়ের ভাষায় যাকে বলে সাইকোসিস? যেখানে রিয়ালিটির সাথে এক প্রকার দূরত্ব সৃষ্টি হয়? জিজ্ঞেস করলাম,
– গুপ্তচর বলতে… প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের মতো?
এখন আমার বোকা বোকা প্রশ্নগুলো করতে হবে। তাকে বুঝতে দিতে হবে যে, সে সুপিরিয়র পর্যায়ে আছে আর আমি শুধুই কৌতুহলী। সাইকোসিসের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মানুষেরা এই এপ্রোচটা পছন্দ করে। সে বলল,
– না। আসল গুপ্তচর। সিক্রেট এজেন্ট।
সে এবার পানি খেল। গ্লাস নামিয়ে খুব যত্ন করে টেবিলের ভেজা দাগটির ওপর গ্লাসটি আবার রাখলো। সে বলে চলল,
– আমার বাবা গুপ্তচর ছিলেন। এমআইসিক্স। পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় কাজ করেছেন। আমেরিকায় তাঁর একটি ঘাঁটি ছিল। এত দিন কেউ আমাকে বলেনি। কিন্তু এখন আমি সব বুঝে গেছি।
– কীভাবে বুঝলে?
– কিছু তথ্য পেয়েছি।
– কী ধরনের তথ্য?
সে আবার হাসল।
– সেগুলো তোমাকে বলা যাবে না। গোপন তথ্য। স্পাইদের গোপন তথ্য বলতে নেই।
আমি মেনে মনে ভাবলাম, “সে তো, কোনো স্পাই কখনো ধুপ করে এসে বলবে না যে সে স্পাই। এইটাই প্রথম রুল। ফাইট ক্লাবের প্রথম রুলের কথা মনে পড়ে গেলো, “You do not talk about Fight Club.” এইসব আমি ঠিক এই সেনসিটিভ সময়টাতেই বসে ভাবছিলাম। সিনেমা-টিনেমা নিয়ে আমি যখন-তখন ভাবতে পারি। একে আপনি আমার খামখেয়ালি বলুন বা প্রতিভা।
যাই হোক, রায়ানের কথার মধ্যে একটি নতুন পরিচয়ের উত্তেজনা ছিল। যেন ছয় মাস আগে যে মানুষটিকে চিনতাম, সে আর নেই। আমার সামনে বসে থাকা লোকটি নিজেকে এমন এক জগতের সদস্য মনে করছে, যেখানে সাধারণ আইন, সম্পর্ক, দায়িত্ব, কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারে না।
আমি কথার বিরোধিতা করলাম না। বিশ্বাসটিকে মেনেও নিলাম না।
শুধু তার গল্পের পরবর্তী দরজাটি খুললাম।
– ফ্রিল্যান্স গুপ্তচর হিসেবে কী ধরনের কাজ করবে?
– যে কাজ পাব।
– যেমন?
রায়ান জানালার দিকে তাকাল।
– কাউকে অনুসরণ করা। কোনো জিনিস উদ্ধার করা। গোপন তথ্য বের করা।
আমি এবার একটু পরখ করতে চাইলাম ওর আনরিয়েল চরিত্রটি কতটা বিপজ্জনক। আমি বললাম,
– আমি তো শুধু মুভিতেই স্পাই দেখেছি। তারা তো সবই করে। মানুষকে মেরেও ফেলে প্রয়োজনে।
রায়ান আমার দিকে ফিরে বললো,
– হ্যাঁ, আমি সেটাও করবো।
বাইরে একটি গাড়ি চলে গেল। ভেজা রাস্তায় চাকার শব্দ কয়েক সেকেন্ড শোনা গেল, তারপর মিলিয়ে গেল।
ঘরের ভেতর আবার সেই ঘড়ি,
টিক।
টিক।
টিক।
আমার বুকের মধ্যে সতর্কতার প্রথম ঘণ্টাটি এবার স্পষ্ট বেজে উঠল।
আমি তার হাতের দিকে তাকালাম। ডান হাতটি টেবিলের ওপর। বাঁ হাত গ্লাসের পাশে। ব্যাগটি মাটিতে। মুখে রাগ নেই।
শুধু প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস।
– তুমি মনে করো, এমন কাজ করার মতো দক্ষতা তোমার আছে?
আমার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই সে নীল কলমটি তুলে নিল।
ক্লিক।
নিব বের হলো।
ক্লিক।
নিব ভেতরে ঢুকল।
– এই কলমটা দেখছ?
– হ্যাঁ।
ক্লিক।
– জানো, এটা দিয়ে কাউকে মেরে ফেলা যায়?
সে কলমের নিবের দিকে তাকিয়ে ছিল না।
তাকিয়ে ছিল আমার চোখে আর তারপর গলায়।
আমি কলমটি দেখলাম। তারপর তার আঙুল। তারপর আমাদের মাঝের দূরত্ব।
মানুষের হাতে ধরা কোনো বস্তু কতটা বিপজ্জনক, তা শুধু বস্তুটি দেখে বোঝা যায় না। বুঝতে হয়, বস্তুটি যে ধরে আছে সে কতটা বিপজ্জনক।
রায়ান তখন একটি কলম দেখছিল না। সে সম্ভাবনা দেখছিল। আমাকে বলল,
– এই সানগ্লাসটা দিয়েও কাউকে মেরে ফেলা সম্ভব।
আমি ভেতরে খুশি এবং সতর্ক, দুটোই হচ্ছিলাম। খুশি কারণ আমার সন্দেহ সত্যি হতে দেখছি। সতর্ক কারণ, একমাত্র তাই আমি হতে পারি এই মুহুর্তে।
আমি ধারণা করে নিলাম, সে হয়তো আমাকে সতর্ক করতে এসেছে না হয় কিছু একটা করে দেখাতে। আমার প্রফেশনে থাকা মানুষদের একটা কাজ করতে করতে একটা বিষয়ে দারুণ অভ্যাস হয়ে যায়। Risk assessment. এই রিস্ক এসেস করার অভ্যাস সাধারণ জীবনেও সবার থাকা উচিত বলে আমার মনে হয়।
রিস্ক এসেসমেন্ট করতে গিয়ে আমি দ্রুত কয়েকটা বিষয় লক্ষ্য করে নিলাম। কারণ, পরবর্তীতে সময় নাও পেতে পারি।
এক. প্যান্টের পকেটের উপর হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম মোবাইলটা আছে কিনা। বুঝলাম, নেই। আড়চোখে দেখে বুঝতে পারলাম সেটা অন্য টেবিলে।
দুই. ঘরের মধ্যে আমি আমার অবস্থানটা বুঝে নিতে চাইলাম। তখনই লক্ষ্য করলাম, সেইদিন যে দুটি ভুল আমি করেছি, তার একটি এটি। আমি বসে আছি যেখানে, ঠিক তার পেছনেই দেয়াল। আর, রায়ান বসে আছে দরজার কাছে। কিন্তু, থেরাপিস্টদের সবসময় শেখানো হয় দরজার দিকটায় বসতে বা দাঁড়াতে যাতে বিপদ দেখলেই বেরিয়ে যাওয়া যায়। এই ভুলটি পরবর্তীতে আমার ক্যারিয়ারে বেশ ভালো এর শিক্ষা হয়ে সামনে এসেছে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কিন্তু, মোমেন্ট থেকে সরে গেলে চলবে না। এই শিক্ষাটাও তো আমাকে দেয়া হয়েছে।
আমি শান্ত গলায় বললাম,
– সিনেমায় কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেখেছি। কিন্তু কাউকে আঘাত বা হত্যা করলে গুরুতর আইনি পরিণতি হবে।
সে হেসে উঠল।
– আমাকে ধরবে কে?
ক্লিক।
– কেউ জানবেই না।
ক্লিক।
– আমি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে কেউ আমাকে ধরতে পারবে না।
তারপর কলমটি আমার চোখের সামনে তুলে বলল,
– এটাও চুরি করেছি।
– কোথা থেকে?
– একটা মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে।
শব্দগুলো সে গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করল।
– তবে আমি চোর নই। শুধু নিজের দক্ষতা পরীক্ষা করেছি। চাইলে পুলিশ স্টেশনে ঢুকেও কিছু নিয়ে বের হয়ে আসতে পারি। পুলিশ টেরও পাবে না।
আমি মুখে আগ্রহ রেখে শুনছিলাম। ভেতরে ভেতরে তার প্রতিটি পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম। কণ্ঠ এখনো নিচু। শ্বাস স্বাভাবিক। শরীর সামনে ঝুঁকেছে। কলমটি তার হাতে ঘুরছে। আমি হতাশ অনুভব করছিলাম কি? না, তা এখনো করিনি।
হঠাৎ সে কলম নামিয়ে রাখল।
তারপর উঠে দাঁড়াল।
আমার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা কিছু নেমে গেল।
রায়ান টেবিল থেকে কাঠের চামচটি তুলে নিয়ে বলল,
– তুমিও দাঁড়াও।
কথাটি অনুরোধের মতো শোনাল না।
এক সেকেন্ড।
হয়তো তারও কম।
কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে মানুষের মাথা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কাজ করতে পারে।
বসে থাকব?
তাহলে সে আমার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।
না বলব?
সে কি সেটাকে চ্যালেঞ্জ ভাববে?
দরজার দিকে যাব?
দরজায় পৌঁছানোর আগেই সে পথ আটকাতে পারবে।
চিৎকার করব?
এই শান্ত আগুনটা তখন বিস্ফোরিত হতে পারে।
ফোন?
চার হাত দূরে।
না।
এখন নয়।
আমি খুব ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। ওর কথা শোনাটাই এখন একমাত্র উপায়।
আমার হাত দুটো শরীরের পাশে। মুঠো বন্ধ করিনি। চোখ তার মুখে রেখেছি, চামচে নয়।
তার সঙ্গে আমার পুরোনো সম্পর্ক আছে। সে আমাকে পছন্দ করে। অন্তত কয়েক মিনিট আগে পর্যন্ত করত।
এই মুহূর্তে আমার একমাত্র ঢাল সেই সম্পর্ক। মাথায় এলো, রায়ান নিয়মিত কমব্যাট ক্লাস করে। ধুর, তাতে কি? অন্তত, শারীরিক প্রতিরোধে আমি ওকে সহজেই কাবু করতে পারবো। শারীরিক গঠনে আমি ওর থেকে শক্তিশালী তো বটেই, আমি নিশ্চিত ওর থেকে এখন আমার মনের জোরটাও বেশী। নিজের এমন আত্মবিশ্বাস দেখে অবাকও হলাম কিছুটা।
রায়ান এগিয়ে এল।
এক হাত।
আধ হাত।
তারপর আমাদের মাঝখানে আর কোনো নিরাপদ দূরত্ব রইল না।
তার গায়ের Lynx বডি স্প্রের গন্ধ নাকে এলো। এই ফ্লেভারটাই সে মেখে আসতো প্রতি বুধবারের সেশনে। তার চোখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। সে চামচটি আমার হাতে দিল। বলল,
– অনুভব করো।
আমি আঙুল দিয়ে চামচের গা স্পর্শ করলাম।
হালকা। মসৃণ। পরিবেশবান্ধব খাবারের দোকানে দেওয়া হয় এমন সাধারণ কাঠের চামচ।
আমার আঙুল চামচে।
কিন্তু তৃতীয় চোখটি অন্যদিকে।
তার ডান হাত কোথায়?
ব্যাগ কত দূরে?
পা দুটো কীভাবে রাখা?
সে আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে কেন?
ভয় দেখতে চায়?
নাকি আনুগত্য?
– কী অনুভব করছ? সে জিজ্ঞেস করল।
– মসৃণ। কাঠের তৈরি।
রায়ানের মুখে হতাশা ফুটল। যেন আমি ঠিক উত্তর দিইনি।
সে আমার বাঁ বাহুর ওপরের অংশ দেখিয়ে বলল,
– কেউ এখানে আঘাত করলে কী করবে?
পরের মুহূর্তেই তার হাত ছুরির মতো নেমে এল।
আমার বাহু ছুঁয়ে থামল। হালকা করে।
– এখন কী করবে?
আমি তার কবজি চেপে ধরলাম না। শুধু আলতো করে হাতটি সরিয়ে দিলাম।
– এভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নেব।
– শুধু এটুকু?
– আমি আক্রমণাত্মক মানুষ নই, রায়ান। নিজেকে রক্ষা করব, কিন্তু লড়াই শুরু করব না।
সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর চামচটি কেড়ে নিল।
– আমি যেটা করলাম, এবার তুমি আমার ওপর করো। হাত লাগাও আমার বাহুতে।
– তার দরকার নেই।
– করো।
এবার শব্দটি আরও নিচু। আরও ঠান্ডা।
কখনো কখনো চিৎকারের চেয়ে ফিসফিসানি বেশি ভয়ংকর। চিৎকার জানিয়ে দেয় মানুষটি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। ফিসফিসানি বলে, সে এখনো নিয়ন্ত্রণে আছে এবং সে জানে সে কী চায়ছে।
আমি বুঝলাম, সে একটি খেলা শুরু করেছে। সেই খেলার নিয়ম তার। আমি খেলতে অস্বীকার করলে সে হয়তো আমাকে নিয়ম শেখাতে চাইবে।
খুব ধীরে তার বাহু স্পর্শ করে একই ভঙ্গি করলাম।
– এভাবে?
রায়ানের মুখে হাসি ফুটল। সন্তুষ্ট শিশুর মতো নয়। পরীক্ষায় শিক্ষককে হারিয়ে দেওয়া ছাত্রের মতো।
তারপর সে নড়ল।
চোখ অনুসরণ করার আগেই শরীর ঘুরে গেল। চামচটি এক হাত থেকে অন্য হাতে গেল। বাতাসে দু-তিনটি দ্রুত ক্যারাতে ভঙ্গি।
ফস।
ফস।
ফস।
তারপর সব স্থির।
কাঠের চামচটির সরু মাথা আমার গলায় এডমস আ্যাপেলের উপরটায় ঠেকে আছে। আমার হৃদস্পন্দন যেন বুক থেকে উঠে এসে চামচের মাথায় ধাক্কা মারছে।
রায়ান আমার চোখের দিকে তাকাল।
– এখানে খুব দ্রুত আঘাত করে টেনে দিলে মানুষ মরে যাবে, তুমি জানো?
তার কণ্ঠে উত্তেজনা নেই। রাগ নেই। অনুশোচনা নেই।
শুধু তথ্য দেওয়ার শান্ত ভঙ্গি।
আমি নিজের শরীরকে বললাম, নড়বে না।
মাথাকে বললাম, থামবে না।
সে কেন এটা করছে? ভয় দেখাতে? ক্ষমতা প্রমাণ করতে আমার প্রতিক্রিয়া দেখতে?
নাকি নিজের মাথার ভেতর তৈরি কোনো অভিযানের rehearsal?
প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার, সে স্বীকৃতি চায়। সে চায় আমি বিশ্বাস করি, সে দক্ষ। সে শক্তিশালী। সে আর সেই পুরোনো, সাহায্যপ্রার্থী রায়ান নয়।
আমাকে তার সেই প্রয়োজনটুকু ব্যবহার করতে হবে।
আমি সামান্য পেছনে সরে হাসার চেষ্টা করলাম। এই প্রফেশনে অভিনয়টা এড অন হিসেবে বেশ কাজে লাগে। তাছাড়া, আমি লিটারেচরের ছাত্র। ব্যাচেলর জীবনে ড্রামা করার দরুন অভিনয় করে ক্লায়েন্টদের সামনে বাড়তি সুবিধা ঠিকই পাই। সে ট্যালেন্টটা এখানে একটু ব্যবহার করলাম। অবাক, বিস্ময় ও কৌতুহল মাখা এক হাসি দিয়ে বললাম,
– দেখছি, সত্যিই অনেক অনুশীলন করেছ। খুব দ্রুত করতে পারো। তোমার skill অনেক বেড়েছে।
চামচটি আমার গলা থেকে সরে গেল।
এক ইঞ্চি।
দুই ইঞ্চি।
তার কাঁধ নরম হলো। মুখে বিজয়ের ছাপ।
আমি নিঃশ্বাস ফেললাম না। দৃশ্যমান স্বস্তি দেখালাম না।
যে মানুষ ভয় দেখিয়ে আনন্দ পাচ্ছে, তাকে নিজের ভয় উপহার দিতে নেই। শুধুই অভিনয়।
দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকালাম। এরপর, জাদুকর যেমন জাদু দেখানোর পর স্টেজে ডাকা দর্শককে আবার দর্শক সারিতে পাঠিয়ে দেন, আমিও তেমন রায়ানের কমব্যাট স্কিল দেখানো শেষে বসে পড়বো পড়বো করছি। রায়ান হাসিমুখে আমার বসে পড়া দেখে সেও তার চেয়ারটায় বসে পড়লো। সে বসার সঙ্গে সঙ্গে আমি আবার উঠে গিয়ে দু ধাপ ফেলে অন্য টেবিলে রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে আবারও অভিনয় শুরু করলাম। ওর দিকে না তাকিয়ে মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে ওকে বললাম,
– রায়ান, তোমার appointment থাকলে আমরা আরও সময় নিয়ে বসতে পারতাম। তুমিতো খুব সাডেন এসেছো। কিন্তু দশ মিনিট পর আমার আরেকটি meeting আছে। চলো, আর দশটা মিনিট আমরা কথা বলি।
আমি চায়লে বলতেই পারতাম, আমার এখনি একটা মিটিং আছে। বিদায়।
কিন্তু, সেটা করলে আমার প্রশংসা শুনে আত্মবিশ্বাস আর আনন্দে গদগদ করা রায়ান ভীষণভাবে ভড়কে যেতে পারে। এই দশটা মিনিট আমাকে ভালোভাবে ব্যবহার করতে হবে কারণ, হয়তো এরপর যদি আর দেখা না হয়।
আমার দশ মিনিটের কথা শুনে ওর হাসি মুছে গেল। সে বলল,
– আমি টেবিলের অন্য জিনিসগুলোর ব্যবহারও দেখাতে চেয়েছিলাম।
চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম, নীল কলম, কালো ডায়েরি, সানগ্লাস। আর কী দেখাত সে?
ডায়েরির ভেতরে কী?
সানগ্লাসের ডাটা দিয়ে কী করে কাউকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা যায়? আর কমলের নিব?
প্রশ্নগুলো মাথায় এল। আমি কোনোটি করলাম না।
কৌতূহল কখনো জ্ঞানের দরজা খোলে। কখনো বিপদের।
– আরেক দিন দেখাবে, বললাম। আজ তুমি এসেছ, কথা বলেছ, এতেই আমি খুশি।
সে ধীরে চেয়ারে বসল।
– মানুষ কীভাবে জানবে যে তুমি freelance spy হিসেবে কাজ করছ?
– জিমে আমার অনেক পরিচিতি। সবাই আমাকে চেনে। আমি খুব accessible। কাজ থাকলে মানুষ আমাকে খুঁজে নেবে।
– কিন্তু গুপ্তচরই কেন?
রায়ান চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিল।
– অ্যাডভেঞ্চার।
তার কণ্ঠ হঠাৎ স্বপ্নময়।
– ভাবো, মেক্সিকোর একটা প্রাসাদে বসে আছি। সন্ধ্যা। হাতে সিগার। সামনে swimming pool। সেখানে এক সুন্দরী নারী বিকিনি পড়া…
সে হাত দিয়ে নারীর শরীরের অবয়ব বোঝাতে লাগল। তার কল্পনায় পৃথিবীটা সিনেমার দৃশ্য। ক্ষমতা, অর্থ, নারী, বিপদ; আর দৃশ্যের ঠিক মাঝখানে সে। কোনো ব্যর্থতা নেই। কোনো চিকিৎসা নেই। কেউ তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করছে না।
আমি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিলাম।
– এখান থেকে কোথায় যাবে?
রায়ান চোখ খুলল।
– কাজ যেখানে নিয়ে যাবে।
উত্তরটি বাতাসে ঝুলে রইল। নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। অথবা আছে, আমাকে বলছে না।
তারপর সে ব্যাগের দিকে হাত বাড়াল।
– তোমার জন্য একটা উপহার আছে।
আমার আঙুল ফোনের পাশ ঘেঁষে রইল।
ব্যাগের চেইন খুলছে।
খসখস শব্দ।
হাতটি ভেতরে ঢুকে গেল।
আমি তার কাঁধ দেখছিলাম। যদি ভেতর থেকে ভারী কিছু তোলে, কাঁধের পেশি আগে বদলাবে। যদি লম্বা কিছু হয়, হাতের কোণ বদলাবে।
সে বের করল একটি ভিডিও গেমের ডিস্ক।
– তুমি গেম খেলো?
– অল্পস্বল্প।
– এটা তোমার।
আমার বুকের চাপ সামান্য কমল। দেখলাম Assassin Creed.
– আমার কথা মনে করে এনেছ, এ জন্য সত্যিই ধন্যবাদ। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী আমি কোনো উপহার নিতে পারি না।
তার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
– নেবে না?
– ইচ্ছা থাকলেও পারছি না। নিয়মটা সবার জন্য একই।
কয়েক সেকেন্ড সে ডিস্ক হাতে বসে রইল। তারপর ব্যাগে ফিরিয়ে রাখল।
– তাহলে একটা উপকার করবে?
– কী?
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
– তুমি যা করছ, সেটা করে যাও। কারণ তুমি এই কাজে সবচেয়ে ভালো। আমাকে অনেক সাহায্য করেছো। আমার দেখা স্মার্ট মানুষগুলোর মধ্যে তুমি একজন। You are good at what you do. Please, carry on.
কথাটা অপ্রত্যাশিতভাবে আমাকে ছুঁয়ে গেল।
কয়েক মিনিট আগে এই মানুষটির হাতে চামচ আমার গলায় ছিল। এখন সেই মানুষটিই আমাকে তার জীবনে দেখা ভালো একজন মানুষ হিসেবে স্বীকার করছে?
মানুষের মন সাদা-কালো নয়।
একই হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা এবং ক্রোধ পাশাপাশি থাকতে পারে। একই মানুষ আপনাকে বিশ্বাসও করতে পারে, আবার পরের মুহূর্তে বিপদেও ফেলতে পারে।
Bi-polar? Dual personality? থাক, সে কথা আর না ভাবি।
– ধন্যবাদ, রায়ান। সত্যিই। I mean it.
আমি কিছুক্ষণ থেমে জিজ্ঞেস করলাম,
– তুমি কি এখনো এলেনার কাছ থেকে সাপোর্ট কোওর্ডিনেশন নিচ্ছ?
তার মুখ বদলে গেল। এক মুহূর্তে। আমাকে বললো,
– কাছে এসো।
আমি সামান্য ঝুঁকলাম। সে ফিসফিস করে বলল,
– আমি এলেনাকে ঘৃণা করি। সে আমাকে বোঝে না। সব সময় বলে, আমার নাকি নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার capacity নেই। আমি নাকি কাজ করতে পারব না। সে কী জানে আমি কি? আমি তাকেই খুঁজতে তোমাদের অফিসে এসেছিলাম। কিন্তু, এসে তোমাকে দেখতে পেলাম।
তার দাঁত শক্ত হয়ে আছে। গালের পেশি কাঁপছে। সে কনিষ্ঠ আঙুল তুলে ধরল।
– এই একটা আঙুলে আমার যত অভিজ্ঞতা, তার সারা জীবনে তত নেই।
আমার ভেতরেও রাগ উঠল। এলেনাকে আমি চিনি। জানি, তিনি কতটা চেষ্টা করেছেন। তার সম্পর্কে এই ভাষা শুনে প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করছিল। পরমুহূর্তেই ভাবলাম, এর আগেও আমি কিংবা এলেনা, দুজনই অনেক মানুষের থেকে ডেথ থ্রেট পেয়েছি। এমন নতুন কিনা না। Comes with the package.
তাছাড়া, আমার রাগের তখন কোনো মূল্য নেই। রাগ বিলাসিতা। নিরাপত্তা প্রয়োজন। অন্তত, এই দশটা মিনিট।
আমি নিজের কণ্ঠ নিচু রাখলাম।
– আমরা সবাই তোমার জন্য নিজের জায়গা থেকে চেষ্টা করছি। তবে তুমি বিষয়গুলো অন্যভাবে দেখছ, সেটা বুঝতে পারছি।
তর্ক নয়। সম্মতিও নয়। শুধু কথোপকথনের দরজাটি খোলা রাখা।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
– চলো। তোমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিই।
সে-ও উঠে দাঁড়াল। আমরা ঘর থেকে বের হলাম। আমি সামনে, সে পেছনে। সেদিন করা আমার আরেকটি ভুল। নিরাপত্তার খাতিরে আমার উচিত ছিলো ওকে সামনে রেখে আমার পেছনে হাঁটা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
করিডোর দিয়ে হাঁটছি।
পেছনে তার পদশব্দ।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
প্রধান দরজায় পৌঁছে হাতল ধরলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো, শব্দ নেই। পেছনে তাকালাম। রায়ান নেই। করিডোর ফাঁকা।
মুহূর্তের মধ্যে আমার মাথার পেছনের সেই তৃতীয় চোখটি আবার খুলে গেল।
কোথায় সে? আমার ঘরে ফিরে গেছে? অন্য কোনো দরজা খুলেছে? কাউকে খুঁজছে? কিছু নিচ্ছে?
রান্নাঘর।
আমি ফিরে গেলাম।
রায়ান কফির কৌটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠ আমার দিকে। শরীর কাউন্টারের খুব কাছে। হাত দুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
এবার চামচ নয়।
রান্নাঘরে ধাতব ছুরি আছে কি?
কাঁচের জার?
গরম পানির কেটলি?
চিন্তাগুলো বিদ্যুতের মতো মাথায় ঝলসে উঠল।
– সব ঠিক আছে, রায়ান?
সে ধীরে ঘুরল।
মুখ শান্ত। আমাকে দেখা খানিক অপ্রস্তুত।
– হ্যাঁ। সব ঠিক আছে।
– চলো, তোমাকে গেট পর্যন্ত দিয়ে আসি।
আমি জানতে চাইলাম না সে কী করছিল। তার পকেটে কী আছে, পরীক্ষা করলাম না। তাকে ধরতে গেলাম না।
এই মুহূর্তে সত্য উদ্ঘাটন আমার কাজ নয়। তাকে ভবনের বাইরে নিয়ে যাওয়া আমার কাজ।
সে আমার সামনে হাঁটল এবার। আর ভুল নয়।
প্রধান দরজা পেরোল। সিঁড়ি নামল। গেটের বাইরে গিয়ে একবার মাথা নাড়ল।
– বাই। Take care.
– নিজের খেয়াল রেখো, রায়ান।
সে রাস্তায় নেমে দূরে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম যতক্ষণ না তাকে মোড় ঘুরে অদৃশ্য হতে দেখেছি।
তারপর অফিসের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম।
তালা ঘোরালাম।
একবার।
দুবার পরীক্ষা করলাম।
সঙ্গে সঙ্গে সহকর্মীদের সতর্ক করা হলো। সামনের দরজা বন্ধ। নতুন কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হলো না। অফিস নিরাপত্তা-প্রটোকল অনুযায়ী lockdown করা হলো।
রায়ান চলে গেছে। কিন্তু বিপদ চলে যায়নি। বিপদ এখন রাস্তায়। কমিউনিটির মধ্যে।
আমি পুলিশকে ফোন করলাম।
এইমাত্র যা ঘটেছে, ক্রমানুসারে জানালাম। সে নিজেকে গুপ্তচর বলেছে। হত্যার contract নেওয়ার কথা বলেছে। কলম দিয়ে মানুষ হত্যা করা সম্ভব বলে দেখিয়েছে। একটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চুরি করার দাবি করেছে। পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার কথা বলেছে। কাঠের চামচ দিয়ে আমার শরীরে আক্রমণের ভঙ্গি করেছে। আমার গলায় সেটি ঠেকিয়ে প্রাণঘাতী হামলার কথা বলেছে। নির্দিষ্ট একজন কর্মীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
আমি বললাম,
– He has left the building. But I believe there is an immediate risk to himself and a risk to others in the community.
তার পোশাকের বর্ণনা দিলাম। কোন দিকে গেছে জানালাম। সম্ভাব্য জায়গাগুলোর কথা বললাম।
তারপর তার ভাইকে ফোন করলাম।
যা ঘটেছে, কিছু না লুকিয়ে সব বললাম। তাকে সতর্ক করলাম। রায়ান যোগাযোগ করলে যেন পরিস্থিতি হালকাভাবে না নেয়। কোথায় আছে জানা গেলে যেন পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানায়।
ফোন শেষ হওয়ার পর বুঝলাম, আমার হাত কাঁপছে।
এতক্ষণ কাঁপেনি।
অথবা কাঁপলেও আমি টের পাইনি।
সেদিন আর কাজ হলো না।
অফিস বন্ধ করে দেওয়া হলো। অফিসের বাইরে পুলিশি টহল শুরু হলো কয়েক ঘন্টার জন্য। সবাইকে নিরাপদে বের করা হলো। বের হওয়ার আগে আমি নিজের ঘরে একবার ঢুকেছিলাম।
চেয়ারটা সরে আছে। টেবিলে আধখাওয়া পানির গ্লাস গ্লাসের নিচে গোল ভেজা দাগ। আমার গলায় কোনো চিহ্ন নেই। বাহুতেও নয়।
কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই কাঠের চামচের মাথাটি আবার এসে নাড়ির ওপর ঠেকছিল। আমি বাড়ি ফিরলাম।
শনিবার কেটে গেল। রবিবারও।
তবু সেই শুক্রবার সকাল শেষ হলো না। খেতে বসলে কলমের ক্লিক শোনা যায়। ঘুমোতে গেলে মনে হয়, কেউ পেছন থেকে তাকিয়ে আছে।
রাস্তায় লম্বা চুলের কাউকে দেখলে বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগে।
বারবার মনে হয়, রায়ান এখন কোথায়? তার হাতে কি এখনো সেই চামচ? তার ব্যাগে আর কী ছিল? সে কি কারও কাছে গেছে? কেউ কি বুঝতে পারছে, তার শান্ত স্বরের নিচে কী চলছে?
সোমবার সকালে অফিসে ঢুকেই আমরা রায়ানের ভাইকে ফোন করলাম। ফোনের ওপাশের কণ্ঠ শুনেই বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঘটেছে।
রায়ানের ভাই জানাল,
শুক্রবার তোমার অফিস থেকে বেরিয়ে রায়ান আরেকটি ক্লিনিকে গিয়েছিল। সেখানে একজন নার্সকে আক্রমণ করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ডাকা হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল। কেউ বিজয় অনুভব করল না। আমি তো নয়ই।
আমার আশঙ্কা সত্য হয়েছিল, এতে কোনো তৃপ্তি নেই। কারণ সেই সত্যের মূল্য একজন নার্সকে দিতে হয়েছে। আরও খারাপ কিছু হতে পারতো।
আমি শুধু শুক্রবারের ঘরটির কথা ভাবছিলাম। সাধারণ একটি অফিস। একজন পুরোনো পরিচিত মানুষ। একটি নীল কলম। একটি কাঠের চামচ। একটি সানগ্লাস। আর চার হাত দূরে পড়ে থাকা একটি ফোন।
সেদিন আমি কোনো অলৌকিক সাহস দেখাইনি। কাউকে পরাস্ত করিনি। বিপদ বুঝে ঝাঁপিয়েও পড়িনি।
আমি ভয় পেয়েছিলাম।
কিন্তু ভয়ের মধ্যেও দেখে গেছি। তার চোখ। হাত। কণ্ঠের ওঠানামা। শরীরের দূরত্ব। কোন কথায় সে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। কোন স্বীকৃতিতে শিথিল হচ্ছে। কখন প্রশ্ন করলে দরজা খুলছে। কখন প্রশ্ন করলে সেই দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আমার মাথার পেছনের সেই অদৃশ্য চোখটি সেদিন বারবার আমাকে সাবধান করেছে। রান্নাঘরে পানি নেওয়ার সময়। কলমের প্রথম ক্লিকে। সে উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্তে। চামচ আমার গলায় ঠেকার সময় এবং প্রধান দরজার সামনে তার পদশব্দ থেমে যাওয়ার পর।
হয়তো মানুষের সত্যিকারের তৃতীয় চোখ বলে কিছু নেই হয়তো আছে। তার আরেক নাম অভিজ্ঞতা। আরেক নাম intuition। আরেক নাম ভয়কে অস্বীকার না করে তার ভেতর দিয়ে দেখতে শেখা।
সেদিন সেই চোখটি খোলা ছিল বলেই আমি বুঝেছিলাম,
রায়ান শুধু আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি। সে এসেছিল নিজের নতুন পরিচয় পরীক্ষা করতে। দেখতে, সে কাউকে ভয় দেখাতে পারে কি না। দেখতে, একটি সাধারণ জিনিসকে অস্ত্র বলে বিশ্বাস করাতে পারে কি না। দেখতে, একজন মানুষ তার সামনে কতক্ষণ স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে পারে।
আমি তাকে হারাইনি।
কিন্তু তার খেলাটিকে আমার অফিসের ভেতরে শেষ হতে দিইনি।
দরজা বন্ধ করেছি। মানুষকে সতর্ক করেছি। পুলিশকে জানিয়েছি। তার পরিবারকে জানিয়েছি।
কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিটি যুদ্ধ কাউকে সুস্থ করে তোলার জন্য হয় না। কিছু যুদ্ধ হয় কয়েক মিনিট সময় কেনার জন্য। কিছু যুদ্ধ হয় একটি ঘরের সবাইকে নিরাপদ রাখার জন্য। আর কিছু যুদ্ধ বাইরে থেকে এতটাই নীরব যে কেউ বুঝতেও পারে না, একজন মানুষ বসে বসে নিজের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর লড়াইটি লড়ছে।
এর মধ্যে দু’মাস কেটে গেলো। কয়েকবার রায়ানের ভাইকে ফোন করে জানতে পেরেছি সে এখনো মেন্টাল হেলথ ইউনিটে আছে। দু মাস পর ফোন করে জানলাম সে বাড়ি ফিরেছে।
এমনই কোনো এক সোমবারে আমি এক ক্লায়েন্টের বাসা থেকে ফিরবো বলে গাড়িতে উঠে বসলাম। হঠাৎ খেয়াল এলো, রায়ানের বাসা এখান থেকে দু ব্লক পরেই। সেই বাড়িতে আমি এর আগেও গিয়েছি। মাথায় কি চাপলো জানিনা। এলেনাকে ফোন করলাম। কারণ, তখন সে আমার ম্যানেজার। ওকে বললাম,
– আমি রায়ানের বাসার খুব কাছেই আছি। ওর বাসা থেকে একটু ঘুরে আসি।
– এই ধরনের পাগলামি তুমি করতে পারো, কিন্তু আমি সায় দেবো না।
– শোনে, আমি অনুমতি নিচ্ছিনা। সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি। যদি বিপদে পড়, তাই তোমাকে জানিয়ে রাখলাম কারণ এটি অফিশিয়াল ভিজিট নয়। অফিসে কাউকে বলো না, প্লিজ।
– ঠিক আছে। ১৫ মিনিট। এর মধ্যে কল করবে। না করলে আমার জানাতেই হবে।
– ডান
আমি গাড়ি চালানো শুরু করলাম। হ্যাঁ বুকটা দুরুদুরু করছে। কিন্তু, আমার মনে হচ্ছিলো রায়ান সাইকোসিস থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমার instinct.
গাড়ি রায়ানের বাড়ির সামনে পার্ক করে বের হলাম। আমি ভেবে রেখেছিলাম বাইরে দাঁড়িয়েই সব কথা সারবো।
ওর দরজায় গিয়ে কয়েকবার ডাকতে হলো। এরপর রায়ান দরজায় এলো। আমাকে দেখে চিনতে একটু সময় লাগলে হয়তো। বলল,
– তুমি এসেছো।
হ্যাঁ, এই রায়ানকে আমি চিনি। এই কন্ঠ, উচ্ছ্বাস, বন্ধুসুলভ জিজ্ঞাসা আমার চেনা। পুরোনো রায়ান। আমি বললাম,
– কেমন আছে তুমি? কতদিন বাদে।
সে বেড়িয়ে এলো। বলল,
– হ্যাঁ। তোমাকে তো আমার অনেক কিছু বলার আছে। আমি এভারটোনে প্রায় দুই মাস ছিলাম। সবাই অনেক ভালো ওখানে। আমাকে আমার গিটার নিয়ে যেতেও এলাউ করেছিলো। তুমি ভেতরে আসো।
– সরি, রায়ান। আমি পাশের আরেকটা বাসায় এসেছিলাম, ভাবলাম, একটু দেখা করে যাই।
– খুব ভালো করেছে। দাঁড়াও, একটা জিনিস দেখাই।
বলেই সে ভেতরে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর একটা পুরোনো ঘড়ি নিয়ে এলো। বলল,
– তুমি অনেক স্মার্ট। তুমি দেখে বলতো ঘড়িটার কোনো মূল্য আছে কিনা? আমি এক অপশপ থেকে কিনেছি।
আমি ঘড়িটা নেড়েচেড়ে দেখলাম। সাধারণ এক ঘড়ি। পেছন দিকে আলাদা এক নকশা। তেমন আহামরি কিছু নয়। তবুও, ওক মন রক্ষার্থে বললাম,
– বেশ হয়েছে। আমার মনে হয় এই ঘড়ির বিশেষত্ব এই নকশা। খুব ভালো একটা ঘড়ি কিনেছো।
আমাকে স্মার্ট বলেছে। ভালো একটা উত্তর নিশ্চয় আশা করছিলে। তাই, এই উত্তর দিলাম।
যাই হোক, আর কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ওকে বললাম এখন যেতে হবে। সে বলল,
– আরেকদিন দেখা করো। তোমাকে অনেক কিছু বলতে চাই।
আমি সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। এই ওকে শেষবার দেখা। অনেক প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার কারণ, আমাদের সেশন চালিয়ে যাওয়া কিংবা আরেকবার দেখা করা সম্ভব হয়নি। এর সমাধান আমার হাতে ছিলো না।
আমি জানি রায়ান তার ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিশক্তির সাথে লড়াই করে আমাদের সেশনের কথা মনে করতে চায়। আজ হঠাৎ দেখা হলে, সে আমাকে চিনতে পারলে আগের মতো করেই উচ্ছ্বাস নিয়ে কথা বলবে আমি জানি।
এই ঘটনার একটা ভালো ইতি আমি ওর বাড়ি গিয়ে টেনে এলাম ঠিকই, কিন্তু আমার মধ্যে তা এক ধরনের পরিবর্তনও নিয়ে এলো। আমি সেই দিনের পর থেকে আর একা অফিসে থাকিনি, বা সবার শেষে অফিস থেকে বের হয়নি।
দরজার ঠিক কাছে বসি।
আরো অনেক সর্তক থাকি।
তবে, আমি আমার প্রফেশনটাকে অনেক উপভোগ করি।
এতো ঘটে যাওয়া অনেক এক্সাইটিং ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি মাত্র।









