লেখাটি ১৮+

মানুষের শরীরের বা জৈবিক চাহিদার একটা ক্যালেন্ডার আছে। সমাজের আর-একটা।

দুটো ক্যালেন্ডার একই প্রকাশনা সংস্থা থেকে বের হয় না।

সমস্যা সেখানেই।

দক্ষিণ এশিয়ায় (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ইত‍্যাদি); একটি বিষয় নিয়ে খুব কম কথা হলেও বিষয়টি নীরবে বহু মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাসের অংশ।

শুরুতেই বলে রাখি, এখানে তৃতীয় লিঙ্গের কথা হচ্ছে না। কিংবা ঠিক সমকামী মানুষের কথাও বলছি না। কারণ, আমাদের একটা পুরনো অভ্যাস হচ্ছে, যে কোনো male-to-male sexual behaviour দেখলেই তাকে কোনো এক sexual orientation বলে ঘোষণা করে দি। যেন আচরণ আর পরিচয় একই বস্তু। অথচ মনোবিজ্ঞানের অভিধান এই সরলীকরণকে খুব একটা সমর্থন করে বলে আমার জানা নেই।

যাই হোক, আমি বলছি এমন কিছু “straight” বা “heterosexual” পুরুষের কথা, যাদের emotional attraction, romantic attraction, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি জীবনের পরিকল্পনাও একজন নারীকে কেন্দ্র করেই। তারা প্রেম করে বা করতে চায় নারীর সঙ্গে। বিয়েও করে বা করতে চায় নারীকেই।

তবু, কোনো এক সময়ে তারা MMM, fr****ng কিংবা অন্য কোনো male-to-male sexual activity-তে জড়িয়ে পড়ে। কখনও সরাসরি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিডিওকলে বা ভার্চুয়ালি।

ঘটনাটা শেষ হওয়ার পরে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে। নিজের কাছেই যেন নিজের জবাবদিহি করতে হয়, “আমি এটা করলাম কেন?” বা হয়তো নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিয়ে বলে, “তুই এতো খারাপ”, “ছিঃ ছিঃ কি না পাপ হলো!” ইত‍্যাদি।

তারপর কিছুদিন কেটে যায়।

ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকা কোনো এক নারীকে দেখে উত্তেজনা বাড়ে।

শরীর আবার দরজায় কড়া দেয়।

এবং আবার সে অন‍্য এক পরিচিত/অপরিচিত পুরুষের সাথে এইসব কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে যার অবস্থা এই পুরুষটির মতোই। লুপ এর মতো এইটা চলতে থাকে।

অপরাধবোধ তখন নৈতিকতার ভাষায় কথা বলে, শরীর কথা বলে জৈববিজ্ঞানের ভাষায়। এই দুই ভাষার অভিধান এক নয়।

আমি একজন mental health practitioner হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বহুবার ভেবেছি; এই মানুষগুলোকে আমরা খুব দ্রুত বিচার করি, কিন্তু কারণগুলো খুব কম বুঝতে চাই।

আমার পর্যবেক্ষণে, সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হলো companionship-এর দীর্ঘ অনুপস্থিতি। সামাজিক নিয়মের কারণে অনেকেই বিপরীত লিঙ্গের কারও সঙ্গে একটি স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না।

কারণ হাজারটা।

হয়তো সে অতিরিক্ত ভদ্র।

হয়তো অতিরিক্ত বখাটে।

হয়তো তার social skill নেই।

হয়তো সাহস নেই।

বা টাকা নেই, বা অনেক টাকা।

হয়তো দেখতে প্রচলিত অর্থে আকর্ষণীয় নয়।

হয়তো কোনো মেয়েই তাকে পাত্তা দিচ্ছে না, মুখের ওপর ‘ভাই’ বানিয়ে দিচ্ছে।

এবং পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসতেই হবে; এমন কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও হয়তো নেই।

তারপর শুরু হয় সমাজের ম‍্যারাথন।

আগে পড়াশোনা।

তারপর চাকরি।

তারপর আরও ভালো চাকরি।

তারপর টাকা।

এরপর আরো একটু বেশী টাকা।

তারপর স্থায়িত্ব।

তারপর বিয়ে।

সমাজ বারবার বলছে, “আরও একটু অপেক্ষা করো।”

কিন্তু শরীর অপেক্ষা করতে শেখেনি।

হরমোন, বিশ্ববিদ্যালয়ের convocation দেখে নিঃসৃত হয় না।

লিবিডো বেতনের স্লিপ দেখে জাগে না।

জৈবিক পরিপক্বতা HR department-এর approval letter-এর অপেক্ষা করে না।

এই জায়গাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়।

আমরা সময়কে খুব সরলভাবে দেখি। ক্যালেন্ডারের পাতায় জানুয়ারির পরে ফেব্রুয়ারি আসে। কিন্তু শরীরের সময় এতটা সরলরেখায় হাঁটে না।

অনেকটা ব্ল‍্যাকহোলের কাছে সময়ের মতো; একই ঘড়ি, অথচ অন্যরকম অভিজ্ঞতা। সমাজ বলছে, “আরও পাঁচ বছর।” শরীর বলছে, “আমার পাঁচ বছর তো ইতিমধ্যেই কেটে গেছে।” Interstellar মুভির Miller’s Planet সিকোয়েন্সটার মতো।

সম্ভবত এই কারণেই প্রাচীন ধর্মীয় পরম্পরায় বারবার একটি কথা ফিরে আসে; যথাসময়ে (বর্তমান সমাজব‍্যবস্থায় যার আরেক অর্থ ‘unsettled’ অবস্থায়) বিয়ে। আমি এটাকে শুধু ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবে দেখি না, বা প্রাগৈতিহাসিক যুগের outdated প্রথাগুলোর একটা হিসেবেও দেখি না।

এর ভেতরে হয়তো মানুষের জৈবিক বাস্তবতাকে বোঝারও একটি চেষ্টা ছিল। অবশ্যই এর মানে এই নয় যে বিয়ে সব সমস্যার সমাধান, কিংবা যার বিয়ে হয়নি সে-ই এমন আচরণ করবে। মানুষ কখনো এত সরল সমীকরণে ধরা দেয় না।

কিন্তু এটাও কি সত্য নয়, দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তি মানুষকে বিকল্প পথ খুঁজতে শেখায়?

আরেকটি বিষয় ভাববার আছে।

“এই generation-এর মধ‍্যেই এইসব কেচ্ছা আছে। কই আমাদের সময়ে তো…”

এই কথাটা হয়তো ঠিক নয়। আমি উল্টোটা ভাবি।

আমার ধারণা, এই আচরণ নতুন নয়। নতুন হলো এর দৃশ্যমানতা।

একসময় মানুষের গোপনীয়তার একমাত্র সাক্ষী ছিল ডায়েরি।

আজ সাক্ষী হলো encrypted chat, anonymous profile আর video call।

আগে পাশের বাড়ির মেয়েটা বা ছেলেটা ঈদে কি জামা কিনলো তা দেখতে পাওয়া যেতে ঈদের দিন ভোরবেলা।

এখন পাশের বাড়ির বান্টুর বাবা সপ্তাহে কয় প‍্যাকেট বিরিয়ানী কিনে বাড়ি ফেরে আর সেই বিরিয়ানী খেয়ে বান্টুর দাদুর কয়দিন বুক জ্বালা করে সেই খবরও পাশের বাড়িতে থেকে আ‍মরা পাই প্রতিদিন। Thanks to facebook reels and stories. এতে অন্তত বিরিয়ানীর দোকান নিয়ে বান্টুর করা ভিডিও রিভিউটা কাজে দেয়।

প্রযুক্তি সবসময় নতুন আচরণ সৃষ্টি করে না।

অনেক সময় প্রযুক্তি কেবল পুরনো আচরণকে দৃশ্যমান করে।

নারীদের ক্ষেত্রে একই বিষয় কতটা ঘটে?

সঠিক উত্তর হলো, আমি এখনো যথেষ্ট investigation করিনি। তাই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না। আমার অনুমান আছে, কিন্তু অনুমানকে তথ্যের ছদ্মবেশ পরাতে আমি রাজি নই।

এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো orientation-কে প্রশ্ন করা নয়। কোনো identity-কে আক্রমণ করাও নয়।

উদ্দেশ‍্য শুধু একটি প্রশ্ন করা।

সমাজ যদি একজন পুরুষকে যৌন ও আবেগগত ঘনিষ্ঠতার বৈধ সুযোগ পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে বলে, অথচ তার শরীর যদি সেই অপেক্ষার ব্যাকরণই না জানে বা বোঝে, তাহলে সেই অপেক্ষার দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করে?

মানুষ?

শরীর?

নাকি সমাজ?