পৃথিবীটা কবে থেকে কুৎসিত হল

ঠিক মনে নেই।

হয়তো যেদিন পাড়ার একশো বছরের বাড়িটা ভেঙে

তার জায়গায় তোলা এপার্টমেন্টের নাম রাখা হল,

“Heritage Residency”,

অথবা যেদিন শেষ গাছটা কেটে সেখানে একটা billboard উঠল,

আর তাতে রিয়াল এস্টেটের বিজ্ঞাপন,

“Live Close to Nature”,

গাছটা ইংরেজি জানত না, বা লাল রং চিনতো না,

তাই প্রতিবাদ করেনি।

শহর এখন খুব পরিষ্কারভাবে বোঝে,

কোন জিনিসের কত দাম।

এক কাঠা জমির দাম জানে,

এক ঘণ্টা পার্কিংয়ের দাম জানে,

এক কাপ কফির দাম জানে,

শুধু বিকেলের দামটা আজও ঠিক করা যায়নি,

এলাকার রিক্সা ভাড়ার মতো,

যে যার মন মতো চায়ছে।

তাই সম্ভবত বিকেল উঠে যাচ্ছে,

দুপুরের পর সন্ধ‍্যা নামে আজকাল,

মানুষের লজ্জা নেমে যাওয়ার মতো,

পুরনো বাড়িগুলোর একটা বদভ্যাস ছিল,

তাদের জানলা প্রয়োজনের চেয়ে বড়,

ছাদ প্রয়োজনের চেয়ে উঁচু,

দরজায় অকারণে নকশা।

অর্থাৎ অর্থনীতির ভাষায় তারা চরিত্রহীন।

এখনকার বাড়িঘর অনেক সভ্য,

এক ইঞ্চিও আবেগ নষ্ট করে না।

আমরাও শিখেছি।

হাঁটলে steps গুনি,

ঘুমোলে sleep score,

পড়লে Goodreads,

দৌঁড়োলে Strava,

খেলে ছবি,

কাঁদলে close friends।

কেবল বেঁচে থাকাটাই এখনও কোনও এ‍্যাপ

ঠিকমতো শেখাতে পারেনি।

সম্ভবত আপডেট আসবে।

আমার এক বন্ধু পাহাড়ে গিয়ে

সূর্যাস্তের সময় বলেছিল,

“একটু সরে দাঁড়া।”

আমি ভেবেছিলাম ও সূর্যটা দেখবে।

ও ছবি তুলল।

ছবিটা সত্যিই খুব সুন্দর হয়েছিল।

সূর্যাস্তটা কেমন ছিলো মনে নেই।

তবে অতীতকে নির্দোষ ভাবারও কোনও কারণ নেই।

পুরনো পৃথিবীতে কারুকাজ করা জানলা ছিল,

জানলার ভিতরে নিষ্ঠুরতাও ছিল।

সুন্দর হাতের লেখায় মৃত্যুদণ্ড লেখা হত।

মানুষ যুদ্ধ থেকে ফিরে বাঁশি বাজাত।

সভ্যতা বরাবরই এক হাতে ফুলদানিটা ঠিক করে

অন্য হাতে গলা টিপেছে।

তাই “আগে সব সুন্দর ছিল”,

এ কথা বলার মতো বোকা এখনও হইনি।

শুধু মনে হয়,

এখন সবই সুন্দর।

রেঁস্তোরা সুন্দর,

এয়ারপোর্ট সুন্দর,

মানুষ সুন্দর,

ব্রেকফাস্ট সুন্দর,

মানুষের loneliness-ও সুন্দর,

ঠিক filter বাছলে।

পৃথিবীটা এতো সুন্দর বোধহয় কোনওদিন ছিল না।

তবু কেন যেন সৌন্দর্যটাই নেই।

হয়তো সৌন্দর্য আসলে

সুন্দর দেখতে কোনও জিনিস নয়।

হয়তো সৌন্দর্য হল,

একটা পুরনো বেঞ্চ যার কোনও business model নেই,

একটা গান যার কোরাস মনে থাকে না,

একটা মানুষ যার সঙ্গে কাটানো সন্ধ‍্যাটার

কোনো ফটোগ্রাফ নেই,

একটা গাছ যে শেইড দেয়

কিন্তু ইনভয়েস দিয়ে বসে না,

আর একটা জানলা, যার বাইরে এমন কিছু নেই

যা দেখতে পৃথিবীর লোক টাকা খরচ করে দেখতে আসবে।

তবু তুমি প্রতিদিন বিকেলে সেখানে এসে দাঁড়াও,

একি সৌন্দর্য নয়?

পৃথিবীটা কুৎসিত হচ্ছে কি না আমি সত্যিই জানি না।

হয়তো আমার বয়সটাই কুৎসিত।

হয়তো প্রত্যেক প্রজন্ম নিজের যৌবনকে ভুল করে

পৃথিবীর যৌবন ভাবে।

তবু একটা ভয় হয়,

আমরা একদিন সব কুৎসিত জিনিস সরাতে সরাতে,

সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসও সরিয়ে ফেলবো।

তারপর থাকবে একটি নিখুঁত শহর।

কোনও ভাঙা বাড়ি নেই,

কোনও আগাছা নেই,

কোনও ভুল বানান নেই,

কোনও বৃদ্ধ দোকানদার নেই,

কোনও উদ্দেশ্যহীন মানুষ নেই।

সবকিছু কাজ করবে।

সবকিছুর দাম থাকবে।

সবকিছুর কারণ থাকবে।

শুধু,

সেখানে থাকার

কোনও কারণ থাকবে না।