আমাদের ভালো থাকারা
পৃথিবীতে এক ধরনের মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে “কেমন আছেন?” প্রশ্নটা কুশলবিনিময় নয় বরং একটি সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী বর্ণনা করবার আমন্ত্রণ।
আপনি নেহাত ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছেন?”
তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। তারপর এমন মুখ করবেন, যেন এই প্রশ্নটির জন্যই গত সাত বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন।
“আর ভালো থাকা…”
এই তিনটি শব্দের পরেই আপনি বুঝবেন, আপনার ভুল হয়ে গেছে।
কারণ আপনি জানতে চাননি তাঁর মেরুদণ্ডের বর্তমান অবস্থা, অফিসের রাজনীতি, ছেলের ভবিষ্যৎ, বাজারদর, দেশের অধঃপতন, পাশের ফ্ল্যাটের অসভ্যতা এবং ২০০৯ সালে এক আত্মীয় তাঁর সঙ্গে কী অন্যায় করেছিলেন। আপনি শুধু “কেমন আছেন” বলেছিলেন। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে প্রশ্ন ছোট হলেও উত্তর মহাকাব্যিক।
অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, মানুষের জীবন মোটামুটি কারওই খুব মসৃণ নয়।
যে লোকটা হাসতে হাসতে বলে, “ভালো আছি”, তার জীবনেও হয়তো গত রাতে ঘুম হয়নি। তারও টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে, সম্পর্ক নিয়ে ক্লান্তি আছে, শরীরে ব্যথা আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় আছে। “ভালো আছি” বলার অর্থ এই নয় যে তার জীবনে কোনো সমস্যা নেই।
অনেক সময় “ভালো আছি” আসলে নিজের দুঃখকে অস্বীকার করা নয়; নিজের দুঃখকে যথাযথ আকারে রাখা।
সব কষ্টকে মাইক্রোফোন দিতে নেই।
কিছু কষ্টকে ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসিয়ে রাখতে হয়, চা দেওয়া যায়, কিন্তু সংসারের কর্তা বানানো যায় না।
আমি নিজে খারাপ থাকলেও প্রায় সবসময় বলি, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।” কেউ বলে, “How are you?” আমি বলি, “Good”, “All good”, “Not bad”, “Great”, “How are you?” ইত্যাদি।
এটা অভিনয় নয়।
বরং আমার মনে হয়, প্রত্যেক সত্য সর্বত্র ঘোষণা করার জন্য তৈরি হয়নি। আমার মন খারাপ একটি সত্য; কিন্তু সেই সত্যের ভার পৃথিবীর প্রত্যেক পরিচিত মানুষের হাতে ধরিয়ে দেওয়া আমার কর্তব্য নয়।
সভ্যতার একটা বড় অংশই সম্ভবত এই ছোট ছোট সংযমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
“কেমন আছেন?”
“ভালো আছি।”
দুজনেই জানেন ব্যাপারটা এত সহজ নয়। তবু কথোপকথন এগিয়ে যায়।
এই সামান্য সামাজিক মিথ্যেটুকুর মধ্যে অদ্ভুত এক মানবিকতা আছে। কারণ মানুষ শুধু সত্য দিয়ে বাঁচে না; মানুষ পরিমিত সত্য দিয়েও বাঁচে।
তবে আরেক ধরনের মানুষ আছেন, যাঁদের মুখ দিয়ে “ভালো আছি” কথাটা যেন বেরোতেই চায় না।
আপনি বললেন, “কেমন আছেন?”
তিনি বললেন, “চলে যাচ্ছে।”
কোথায় যাচ্ছে, কে নিয়ে যাচ্ছে, ফেরত আসবে কি না, কিছুই জানা যায় না।
অথবা বলবেন, “এই তো…”
এই “এই তো”-র মধ্যে পৃথিবীর যাবতীয় ব্যর্থতা এমনভাবে জমা থাকে, যেন সভ্যতার শেষ সূর্যাস্তটি তিনি একাই প্রত্যক্ষ করেছেন।
আরেকটু উন্নত সংস্করণ, “ভালো আর কই?”
এই বাক্যের অসাধারণ সুবিধা হলো, আপনি এর বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি দিতে পারবেন না। আপনি যদি বলেন, “কেন, কী হয়েছে,” আপনি ফাঁদে পড়লেন। আর যদি বলেন, “আচ্ছা”, আপনি হৃদয়হীন।
অবশ্যই মানুষ সব সময় ভালো থাকবে না। বিষণ্ণতা আছে, শোক আছে, অসুস্থতা আছে, এমন দিন আছে যখন “ভালো আছি” বলাটাও নিজের সঙ্গে প্রতারণা মনে হয়। কাছের মানুষের কাছে নিজের কষ্ট খুলে বলা দুর্বলতা নয়; বরং বহু সময় সেটাই সুস্থতার লক্ষণ।
কিন্তু আমি সেই গভীর কষ্টের কথা বলছি না।
আমি বলছি সেই অদ্ভুত অভ্যাসটির কথা, যেখানে অসন্তোষ ধীরে ধীরে অনুভূতি থেকে ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়।
মানুষটি আর সমস্যায় নেই; সমস্যা তাঁর পরিচয় হয়ে গেছে।
তাঁর জীবনে দশটি জিনিস ঘটেছে, সাতটি মোটামুটি ভালো, দুটি নিরপেক্ষ, একটি খারাপ। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্কের সংবাদসম্পাদক প্রথম পাতায় ছাপবেন ওই একটিই।
শিরোনাম:
“সব শেষ।”
সাতটি ভালো খবর যাবে ভিতরের পাতায়, তাও সংক্ষেপে।
মানুষের মন এমনিতেই অভাবের দিকে বেশি তাকায়। যা আছে, তা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়; যা নেই, তা প্রতিদিন নতুন লাগে। সুস্থ শরীর নিয়ে আমরা সকালে উঠি, খবর হয় না। দাঁতে ব্যথা শুরু হলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে দাঁত মহাবিশ্বের কেন্দ্রে চলে আসে।
সুখের সম্ভবত এই দুর্ভাগ্য, সে খুব দ্রুত অভ্যাস হয়ে যায়।
দুঃখের সুবিধা—সে নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়।
তাই “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি” কথাটির মধ্যে আমার কাছে এক ধরনের দর্শন আছে।
এর মানে এই নয়, আমার সব আছে।
এর মানে হতে পারে, যা নেই, আজ তাকে আমার সমস্ত অস্তিত্বের সংজ্ঞা হতে দেব না।
আমার জীবনে অসম্পূর্ণতা আছে, কিন্তু আমার জীবন শুধু অসম্পূর্ণতার নাম নয়।
কৃতজ্ঞতা সম্ভবত সুখী মানুষের পুরস্কার নয়; অনেক সময় সুখী হওয়ার একটি পদ্ধতি।
আমরা সাধারণত ভাবি, আগে জীবন ভালো হবে, তারপর আমি বলব “ভালো আছি।”
হয়তো উল্টোটাও কিছুটা সত্য।
কখনও কখনও “ভালো আছি” বলতে বলতে মানুষ আবিষ্কার করে, সত্যিই তো পুরোপুরি ভালো না হলেও, পুরোপুরি খারাপও তো নেই।
শ্বাস চলছে। কিছু মানুষ এখনও ফোন করে। চা এখনও ভালো লাগে। কোনো একটা গান হঠাৎ পুরোনো বিকেল ফিরিয়ে আনে। রাতে আকাশ দেখা যায়। আগামীকাল সম্পর্কে এখনও সামান্য কৌতূহল আছে।
মানুষের ভালো থাকার জন্য এগুলো খুব ছোট কারণ মনে হয়।
সমস্যা হলো, খারাপ থাকার কারণগুলোকেও দূর থেকে দেখলে অধিকাংশ সময় খুব বড় মনে হয় না।
জীবন সম্ভবত “সব ঠিক হয়ে যাওয়া”-র নাম নয়।
কারণ সব ঠিক হয়ে যাওয়ার দিনটি ক্যালেন্ডারে নেই।
একটা সমস্যা মিটবে, আরেকটা আসবে। একটা চিন্তা যাবে, আরেকটা দরজায় জুতো খুলবে। আমরা যদি সমস্ত সমস্যা শেষ হওয়ার পর ভালো থাকার সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে ভালো থাকা অবসরের পরের কোনো প্রকল্প হয়ে থাকবে, এবং অবসরেও হাঁটুর ব্যথা শুরু হবে।
তাই “ভালো আছি” কখনও পরিস্থিতির রিপোর্ট নয়।
এটা অবস্থান।
জীবনের বিরুদ্ধে মানুষের ছোট্ট একটি রাজনৈতিক ঘোষণা:
তুমি আমাকে যথেষ্ট ঝামেলা দিয়েছ, কিন্তু আমার সমস্ত অনুভূতি দখল করতে পারোনি।
আমি এখনও কাউকে দেখে হাসতে পারি।
আমি এখনও জিজ্ঞেস করতে পারি, “আপনি কেমন আছেন?”
এবং আমার নিজের ভিতরে পাঁচটা যুদ্ধ চললেও বলতে পারি,
“ভালো আছি।”
হয়তো ভালো থাকা সব সময় অনুভূতি নয়।
কখনও কখনও ভালো থাকা একটি শিষ্টাচার।
কখনও একটি অভ্যাস।
কখনও একটি সিদ্ধান্ত।
আর কখনও, সৃষ্টিকর্তা ও জীবনের কাছে নীরবে স্বীকার করা:
সব পাইনি। সব ঠিকও নেই। তবু যা পেয়েছি, তাকে ছোট করে দেখার মতো অকৃতজ্ঞ এখনও হয়ে যাইনি।








