একটি মেলানকোলি কবিতা

একটি মেলানকোলি কবিতা

পৃথিবীটা কবে থেকে কুৎসিত হল

ঠিক মনে নেই।

হয়তো যেদিন পাড়ার একশো বছরের বাড়িটা ভেঙে

তার জায়গায় তোলা এপার্টমেন্টের নাম রাখা হল,

“Heritage Residency”,

অথবা যেদিন শেষ গাছটা কেটে সেখানে একটা billboard উঠল,

আর তাতে রিয়াল এস্টেটের বিজ্ঞাপন,

“Live Close to Nature”,

গাছটা ইংরেজি জানত না, বা লাল রং চিনতো না,

তাই প্রতিবাদ করেনি।

শহর এখন খুব পরিষ্কারভাবে বোঝে,

কোন জিনিসের কত দাম।

এক কাঠা জমির দাম জানে,

এক ঘণ্টা পার্কিংয়ের দাম জানে,

এক কাপ কফির দাম জানে,

শুধু বিকেলের দামটা আজও ঠিক করা যায়নি,

এলাকার রিক্সা ভাড়ার মতো,

যে যার মন মতো চায়ছে।

তাই সম্ভবত বিকেল উঠে যাচ্ছে,

দুপুরের পর সন্ধ‍্যা নামে আজকাল,

মানুষের লজ্জা নেমে যাওয়ার মতো,

পুরনো বাড়িগুলোর একটা বদভ্যাস ছিল,

তাদের জানলা প্রয়োজনের চেয়ে বড়,

ছাদ প্রয়োজনের চেয়ে উঁচু,

দরজায় অকারণে নকশা।

অর্থাৎ অর্থনীতির ভাষায় তারা চরিত্রহীন।

এখনকার বাড়িঘর অনেক সভ্য,

এক ইঞ্চিও আবেগ নষ্ট করে না।

আমরাও শিখেছি।

হাঁটলে steps গুনি,

ঘুমোলে sleep score,

পড়লে Goodreads,

দৌঁড়োলে Strava,

খেলে ছবি,

কাঁদলে close friends।

কেবল বেঁচে থাকাটাই এখনও কোনও এ‍্যাপ

ঠিকমতো শেখাতে পারেনি।

সম্ভবত আপডেট আসবে।

আমার এক বন্ধু পাহাড়ে গিয়ে

সূর্যাস্তের সময় বলেছিল,

“একটু সরে দাঁড়া।”

আমি ভেবেছিলাম ও সূর্যটা দেখবে।

ও ছবি তুলল।

ছবিটা সত্যিই খুব সুন্দর হয়েছিল।

সূর্যাস্তটা কেমন ছিলো মনে নেই।

তবে অতীতকে নির্দোষ ভাবারও কোনও কারণ নেই।

পুরনো পৃথিবীতে কারুকাজ করা জানলা ছিল,

জানলার ভিতরে নিষ্ঠুরতাও ছিল।

সুন্দর হাতের লেখায় মৃত্যুদণ্ড লেখা হত।

মানুষ যুদ্ধ থেকে ফিরে বাঁশি বাজাত।

সভ্যতা বরাবরই এক হাতে ফুলদানিটা ঠিক করে

অন্য হাতে গলা টিপেছে।

তাই “আগে সব সুন্দর ছিল”,

এ কথা বলার মতো বোকা এখনও হইনি।

শুধু মনে হয়,

এখন সবই সুন্দর।

রেঁস্তোরা সুন্দর,

এয়ারপোর্ট সুন্দর,

মানুষ সুন্দর,

ব্রেকফাস্ট সুন্দর,

মানুষের loneliness-ও সুন্দর,

ঠিক filter বাছলে।

পৃথিবীটা এতো সুন্দর বোধহয় কোনওদিন ছিল না।

তবু কেন যেন সৌন্দর্যটাই নেই।

হয়তো সৌন্দর্য আসলে

সুন্দর দেখতে কোনও জিনিস নয়।

হয়তো সৌন্দর্য হল,

একটা পুরনো বেঞ্চ যার কোনও business model নেই,

একটা গান যার কোরাস মনে থাকে না,

একটা মানুষ যার সঙ্গে কাটানো সন্ধ‍্যাটার

কোনো ফটোগ্রাফ নেই,

একটা গাছ যে শেইড দেয়

কিন্তু ইনভয়েস দিয়ে বসে না,

আর একটা জানলা, যার বাইরে এমন কিছু নেই

যা দেখতে পৃথিবীর লোক টাকা খরচ করে দেখতে আসবে।

তবু তুমি প্রতিদিন বিকেলে সেখানে এসে দাঁড়াও,

একি সৌন্দর্য নয়?

পৃথিবীটা কুৎসিত হচ্ছে কি না আমি সত্যিই জানি না।

হয়তো আমার বয়সটাই কুৎসিত।

হয়তো প্রত্যেক প্রজন্ম নিজের যৌবনকে ভুল করে

পৃথিবীর যৌবন ভাবে।

তবু একটা ভয় হয়,

আমরা একদিন সব কুৎসিত জিনিস সরাতে সরাতে,

সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসও সরিয়ে ফেলবো।

তারপর থাকবে একটি নিখুঁত শহর।

কোনও ভাঙা বাড়ি নেই,

কোনও আগাছা নেই,

কোনও ভুল বানান নেই,

কোনও বৃদ্ধ দোকানদার নেই,

কোনও উদ্দেশ্যহীন মানুষ নেই।

সবকিছু কাজ করবে।

সবকিছুর দাম থাকবে।

সবকিছুর কারণ থাকবে।

শুধু,

সেখানে থাকার

কোনও কারণ থাকবে না।

হে বন্ধু ইরফান

হে বন্ধু ইরফান

~তোমার মতোই একদিন অভিনয় করা বন্ধ করে দেবে এই পৃথিবী, ও বন্ধু;

শেক্সপিয়ারের এই রঙ্গমঞ্চটায় আর কাউকে মিথ্যে অভিনয় করতে হবে না,

যেমনটি তুমি করোনি কখনোই,

তোমার চোখের মতো চোখ কথা বলবে সবার,

তোমার কষ্ট ভরা আওয়াজ ধ্বনিত্ব হবে পৃথিবী নামক এই থিয়েটারের আপার ক্লাস থেকে লোয়ার ক্লাসে,

ফ্রন্ট ডোর থেকে এক্সিট পয়েন্টে,

হাত তালিতে গমগম করবে পুরো দুনিয়া,

কারণ, তুমিতো সংলাপে একটাও মিথ্যে কথা বলোনি;

তুমি যেমনটা বলেছো, “সমুদ্রটাও আমি, এই গাছটাও আমি, ঝেলুম নদীটাও আমি, এসপেন গাছটাও আমি, আমি মন্দির, আমি সিয়া, আমি সুন্নী, আমি পন্ডিত, আমি সেখানে ছিলাম, এখানে আছি, আগামীকালেও থাকবো।”

শেষ বেলটা বেজে গেলো, হে বন্ধু;

আবারো তোমার নতুন চরিত্রের সংলাপ কানে বিঁধবে ইস্পলিন্টারের মতো, আবারো হাততালিতে গমগম;

তবে তোমার বুক চাপা কষ্ট নিয়ে দেয়া হাসিটা আর কেউ হাসতে পারবেনা,

আক্ষেপটা চলে যাক, তোমার সাথেই তোমার মতোই;

রুপ বদলাক, অবতীর্ণ হোক নতুন এক চরিত্রে;

যেমনটা তুমি হলে আজ, এতো নিঁখুতভাবে আগের মতোই।

হে প্রিয় বন্ধু ইরফান।~

আমার এমন রোগ

আমার এমন রোগ

আমার মধ্যে এক রোগ বাস করছে,

সবকিছু মনে রাখার রোগ, মানুষ মনে রাখার রোগ;

আমার চোখের দেড়শ ডিগ্রির সীমারেখার মধ্যে আমি আজ পর্যন্ত যতজন মানুষকে বেঁধে রেখেছি,

তাদের সবার সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকা একেকটি মুহূর্ত মনে রাখার রোগ;

বেশ কয়েক বছর ধরেই এমন একটি রোগে ভুগছি আমি,

এর কোনো কেমো নেই, থেরাপী নেই, আয়ুর্বেদ নেই, নেই কোনো ভ্যাক্সিন কিংবা এন্টিডট;

নিজেই নিজেকে কনসাল্ট করছি, রোজ মধ্যদুপুরে স্মৃতিসংঘের চেম্বারে আমার সাথে আমার দেখা হচ্ছে;

একই প্রেসকিপশন, সেই হেক্সশলের গন্ধ;

ওই প্রেসকিপশনে একই দাগের ওপর কলম ঘোরাচ্ছি;

মনবিদ্যা বলছে, এই রোগের একটাই ঔষধ পাওয়া গেছে আজ পর্যন্ত;

মৃত্যু।

হে বন্ধু ইরফান

হে বন্ধু ইরফান

~তোমার মতোই একদিন অভিনয় করা বন্ধ করে দেবে এই পৃথিবী, ও বন্ধু;

শেক্সপিয়ারের এই রঙ্গমঞ্চটায় আর কাউকে মিথ্যে অভিনয় করতে হবে না,

যেমনটি তুমি করোনি কখনোই,

তোমার চোখের মতো চোখ কথা বলবে সবার,

তোমার কষ্ট ভরা আওয়াজ ধ্বনিত্ব হবে পৃথিবী নামক এই থিয়েটারের আপার ক্লাস থেকে লোয়ার ক্লাসে,

ফ্রন্ট ডোর থেকে এক্সিট পয়েন্টে,

হাত তালিতে গমগম করবে পুরো দুনিয়া,

কারণ, তুমিতো সংলাপে একটাও মিথ্যে কথা বলোনি;

তুমি যেমনটা বলেছো, “সমুদ্রটাও আমি, এই গাছটাও আমি, ঝেলুম নদীটাও আমি, এসপেন গাছটাও আমি, আমি মন্দির, আমি সিয়া, আমি সুন্নী, আমি পন্ডিত, আমি সেখানে ছিলাম, এখানে আছি, আগামীকালেও থাকবো।”

শেষ বেলটা বেজে গেলো, হে বন্ধু;

আবারো তোমার নতুন চরিত্রের সংলাপ কানে বিঁধবে ইস্পলিন্টারের মতো, আবারো হাততালিতে গমগম;

তবে তোমার বুক চাপা কষ্ট নিয়ে দেয়া হাসিটা আর কেউ হাসতে পারবেনা,

আক্ষেপটা চলে যাক, তোমার সাথেই তোমার মতোই;

রুপ বদলাক, অবতীর্ণ হোক নতুন এক চরিত্রে;

যেমনটা তুমি হলে আজ, এতো নিঁখুতভাবে আগের মতোই।

হে প্রিয় বন্ধু ইরফান।~

বাম দিকের সিঁথি

বাম দিকের সিঁথি

কপাল বেয়ে চুয়েছিলো ভালোবাসার ঘাম,

আমি খুঁজে গিয়েছিলাম ফাঁকা এক গলি,

অষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকা বুকের অভিমান,

ভুলতে বসা বিশ টাকার ওই দিনগুলি,

উদ্দেশ্যহীন রাস্তা-ঘাটে গিটারের সন্ধান,

ভাঙা তারে সুরের বড্ড বোঝ,

ডান দিকের ওই চুলের ভাঁজটা ঠিকই তো ছিলো,

এখন বাম দিকটায় কেনো করছো সিঁথি রোজ?

কতটা রঙ লাগবে তোমার; আমি রঙিন করতে চাই,

ভেজা ভেজা সন্ধ্যা বেলাকে,

লুকিয়েছে আজ কোনো কবিতায়!,

এক গোপন আংটি আঙুলের ফাঁকে,

হাওয়া বদলে গেছে নাকি আমি বদলেছি?

এই বদলানোটাই রেখেছিলো খোঁজ,

ডান দিকের ওই চুলের ভাঁজটা ঠিকই তো ছিলো,

এখন বাম দিকটায় কেনো করছো সিঁথি রোজ।